বন্ধ শিল্প চালুতে ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল

মন্থর অর্থনীতিতে গতি ফেরানো এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবনের বড় উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকা কারখানাগুলোকে ফের উৎপাদনে ফেরাতে গঠন করা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রাক-অর্থায়ন স্কিম। যার আওতায় যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে পাবে ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ঋণ, যেখানে বিশেষ অগ্রাধিকার পাবে রপ্তানিমুখী খাত।
তফসিলি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে গঠিত এ স্কিমের মূল লক্ষ্য— বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং রপ্তানি বৈচিত্র্য আনা। গতকাল বৃহস্পতিবার জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, দক্ষ ব্যবস্থাপনা থাকলে বন্ধ শিল্প অধিগ্রহণ করেও সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকার এ ঋণ সুবিধা নেওয়া যাবে। ব্যাংক পর্যায়ে সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ শতাংশ এবং গ্রাহকপর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ। প্রথম ছয় মাস থাকবে গ্রেস পিরিয়ড, এরপর শুরু হবে সুদ আদায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন স্কিম’ নামের এ তহবিলের আওতায় আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ, কিন্তু পুনরায় চালু করা সম্ভব এমন শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানকে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সহায়তা দেওয়া হবে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক স্বল্প সুদে এ অর্থ ব্যাংকগুলোকে ঋণ হিসেবে দেবে এবং ব্যাংকগুলো যাচাই-বাছাই করে যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে দেবে ঋণ।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, দেশে কার্যরত সব তফসিলি ব্যাংক অংশ নিতে পারবে এই স্কিমে। এজন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-৩-এর সঙ্গে করতে হবে অংশগ্রহণ চুক্তি। স্কিমটি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে পরিচালিত হবে এবং যার মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে তিন বছর। ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ প্রতিষ্ঠান, কিংবা সচল থাকলেও ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের অভাবে পূর্ণ উৎপাদনে যেতে পারছে না— এমন প্রতিষ্ঠানগুলো বিবেচিত হবে যোগ্য হিসেবে। রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে অগ্রাধিকার। এ ছাড়া দক্ষ ব্যবস্থাপনা থাকলে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ শিল্প অধিগ্রহণ করে চালু করলেও তারা এ সুবিধা পেতে পারে।
ঋণ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা, বন্ধ হওয়ার কারণ, বাজার পরিস্থিতি এবং ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা যাচাই করতে হবে বিস্তারিতভাবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে হবে। বাণিজ্য সংগঠনের প্রত্যয়নপত্র থাকলে তা বিবেচনায় নেওয়া হবে, তবে না থাকলেও ব্যাংক নিজস্ব যাচাইয়ের মাধ্যমে নিতে পারবে সিদ্ধান্ত।
খেলাপি ঋণগ্রহীতা, অর্থ পাচার বা জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠান ঋণ পাবে না এ স্কিমের আওতায়। একই সঙ্গে অন্য কোনো পুনঃঅর্থায়ন স্কিম থেকে সুবিধা নেওয়া প্রতিষ্ঠানকে নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অবলম্বন করতে হবে বাড়তি সতর্কতা। এ তহবিলের অর্থ শ্রমিকদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল, কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন ব্যয় ও রপ্তানি অর্ডার বাস্তবায়নে করা যাবে ব্যবহার। বেতন বাবদ সর্বোচ্চ চার মাসের অর্থ দেওয়া যাবে এবং তা সরাসরি শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাবে জমা দিতে হবে— লেনদেন করা যাবে না কোনো নগদ।
ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানকে নিজ ব্যাংকের মাধ্যমেই এ ঋণ নিতে হবে এবং নির্ধারিত হিসাবের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে সব লেনদেন। বিদ্যমান কোনো ঋণ সমন্বয়ের জন্য ব্যবহার করা যাবে না এই অর্থ। ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদে নিয়োগ করতে পারবে প্রতিনিধি।
ঋণের ঝুঁকি সম্পূর্ণভাবে বর্তাবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওপর এবং গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ আদায়ের দায়ও ব্যাংকের। ঋণের অপব্যবহার বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে নেওয়া হবে আইনগত ব্যবস্থা। তবে ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো নিজস্ব বিনিয়োগ পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করতে পারবে এ স্কিম। সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করবে স্কিমের শর্তাবলি।




