বিপর্যয়ের শঙ্কা আবাসন খাতে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে যৌথ উন্নয়ন চুক্তির আওতায় জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর আরোপ করা হয়েছে ১৫ শতাংশ কর। আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই করের কারণে দেশের আবাসন খাত বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জমি সমর্পণ করে ফ্ল্যাট নেওয়ার এই মূল চালিকাশক্তি বা প্রচলিত ব্যবসায়িক কাঠামোটি এই ১৫ শতাংশ করের কারণে পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়বে, যার চড়া মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হবে দেশের সাধারণ ফ্ল্যাট ক্রেতা ও ভাড়াটিয়াদের।
বিদ্যমান করনীতি অনুযায়ী, কর সাধারণত অর্জিত আয় বা প্রকৃত মুনাফার ওপর ধার্য করা হয়। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে জমির মালিক যখন ডেভেলপারের কাছ থেকে ফ্ল্যাট বুঝে পাবেন, তখনই তাকে ১৫ শতাংশ কর দিতে হবে।
রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল এই পদ্ধতিকে অবাস্তব আখ্যা দিয়ে বললেন, ‘জমির মালিক যখন ফ্ল্যাট বুঝে পান, তখন তিনি কোনো নগদ অর্থ হাতে পান না,
বরং একটি স্থাবর সম্পদ পান। বিশ্বের সব দেশে সম্পদ বিক্রি করে যখন নগদ টাকা আসে, তখন কর ধরা হয়, কিন্তু এখানে অবাস্তব কাগজের মূল্যের ওপর আগাম কর চাপানো হচ্ছে, যা করের মৌলিক দর্শনের পরিপন্থী।’
এই করের প্রভাব কেমন হবে। যেমন— ১০ কাঠা জমিতে ২৪টি ফ্ল্যাটের একটি যৌথ প্রকল্পে জমির মালিক যদি ১২টি ফ্ল্যাট পান এবং প্রতিটির বাজারমূল্য ১ কোটি টাকা হয়, তবে জমির অর্জন মূল্য বাদ দিয়ে তাকে প্রায় ১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা কর দিতে হবে। শুধু কর পরিশোধের জন্যই মালিককে প্রায় দুটি ফ্ল্যাটের সমপরিমাণ নগদ অর্থ জোগাড় করতে হবে, যা অধিকাংশ মধ্যবিত্ত বা অবসরপ্রাপ্ত জমির মালিকের পক্ষে অসম্ভব।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই করের ফলে বাজারে নীতিগত অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা ১ জুলাইয়ের পর বড় ধরনের প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা তৈরি করবে। জমির মালিকের কাছে নগদ টাকা থাকবে না, আবার ডেভেলপার বলবেন চুক্তির সময় এই কর ছিল না; ফলে দায় ঠেলাঠেলির কারণে ফ্ল্যাট হস্তান্তর আটকে যাবে। আবার ফ্ল্যাটের মূল্য কে এবং কীভাবে নির্ধারণ করবে, তা নিয়ে নতুন আইনি বিরোধ তৈরি হবে। এর চেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো, পুরান ঢাকা, ধানমন্ডি বা চট্টগ্রামের মতো এলাকায় পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে যৌথ মডেলের বহুতল এবং নিরাপদ ভবন করার যে রূপান্তর শুরু হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ থমকে যাবে।
রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক বললেন, দীর্ঘমেয়াদি যৌথ উন্নয়ন প্রকল্পে হুট করে এমন করের বোঝা চাপানোয় নীতিগত অনিশ্চয়তা দেখা দেবে, যা ফ্ল্যাট হস্তান্তরকে বিলম্বিত করবে। ফলে পরিকল্পিত নগরায়ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন পুনর্নির্মাণ বাধাগ্রস্ত হবে; যার ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো অতিরিক্ত করের চূড়ান্ত বোঝা গিয়ে পড়ে ভোক্তার ঘাড়ে। জমির সংকট থাকায় মালিকরা এই করের ব্যয় শেষ পর্যন্ত ডেভেলপারের ওপর চাপাবেন এবং ডেভেলপাররা প্রকল্প ব্যয় সমন্বয় করতে ফ্ল্যাটের দাম বাড়াতে বাধ্য হবেন। ফ্ল্যাটের মূল্য মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে যাবে। বাজারে নতুন ফ্ল্যাটের সরবরাহ কমে গেলে দীর্ঘ মেয়াদে বড় শহরগুলোয় বাসাভাড়া আকাশচুম্বী হয়ে উঠবে। এর ফলে যারা আজ ভাড়া বাসায় থাকছেন, তারাও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক গতিশীলতা ধরে রাখতে রিহ্যাব সরকারের কাছে কিছু বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। তারা মনে করে, ফ্ল্যাট হস্তান্তরের সময় নয়, বরং জমির মালিক যখন সেই ফ্ল্যাট ভবিষ্যতে বিক্রি করে প্রকৃত নগদ অর্থ বা মুনাফা ঘরে তুলবেন, তখন কর আরোপ করা যুক্তিযুক্ত। এ ছাড়া নিজের বসবাসের জন্য প্রাপ্ত ফ্ল্যাটকে সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখা এবং এককালীন করের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে এই নীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মূল্যায়নের জন্য এনবিআর, রিহ্যাব, অর্থনীতিবিদ ও জমির মালিকদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি যৌথ পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।




