আইএমএফের সঙ্গে বৈঠক শুরু রবিবার
নতুন ঋণের আগে ৪ খাতে কড়া নজর

ছবি: এআই
নতুন ঋণ কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে বৈঠকে দেশের ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিতসহ চারটি খাত গুরুত্ব পাচ্ছে। অন্যসব খাত হচ্ছে—আর্থিক স্থিতিশীলতা, মুদ্রা বিনিময় হার ও রাজস্ব আহরণ। আইএমএফ মনে করছে, ব্যাংক খাতে কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। আর জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আদায়ের হার অত্যন্ত কম, যা সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ও আর্থিক সক্ষমতার জন্য বড় বাধা।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর, আর্থিক খাতের বিভিন্ন সংস্কারের বাস্তব অগ্রগতি জানতে চাইবে আইএমএফ। শনিবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ১২ সদস্যের মিশন নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করতে ঢাকায় পৌঁছেছে। এবারের মিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আইএমএফের মুদ্রা ও পুঁজিবাজার বিভাগের ডেপুটি ডিভিশনপ্রধান ইভো ক্রজনার। ঢাকা সফরকালে আগামীকাল রবিবার থেকে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সংস্থার প্রতিনিধিদলটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করবে।
এর আগে ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ বসন্তকালীন বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। সেই প্রেক্ষাপটকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
আলোচনার অংশ হিসেবে সচিবালয়ে রবিবার অর্থমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক রয়েছে তাদের। অর্থ বিভাগের সঙ্গে বৈঠকে সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো নিয়ে আলোচনা করবে আইএমএফ।
আইএমএফের সঙ্গে নতুন কর্মসূচির আওতায় তিন বছরের জন্য ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ পাওয়ার আশা করছে সরকার। এই অর্থ সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ সামাল দেওয়া ও অর্থনৈতিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ বিষয়টি লিখিতভাবে সংস্থাটিকে অবহিত করা হয়েছে।
এদিকে গত জুনে ওয়াশিংটনে আইএমএফের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সংস্থাটির যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক জুলি কোজ্যাক বলেছেন, বাংলাদেশ সরকার নতুন কর্মসূচির আবেদন করেছে এবং আইএমএফ কর্মকর্তারা সরকারের সঙ্গে সংস্কার এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা করছেন। তিনি স্পষ্ট করলেন, নতুন কর্মসূচি অনুমোদনের জন্য নির্বাহী পর্ষদে যাওয়ার সময় বিদ্যমান কর্মসূচি বাতিল করা হবে। কারণ, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হয়েছে। তাই নতুন সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী নতুন কর্মসূচি প্রণয়ন করাই উপযুক্ত।
এ বক্তব্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা। তাদের মতে, এটি শুধু ঋণ নবায়ন নয়; বরং বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক সংস্কার রোডম্যাপ তৈরির প্রক্রিয়া।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সদ্য ঘোষিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিভিন্ন করছাড়ের যৌক্তিকতা, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতা, আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সংস্কারের অগ্রগতি, করব্যয়ের সংস্কার ও আর্থিক খাত সংস্কারের কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
ব্যাংক খাতও থাকবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ব্যাংক খাতে সুশাসন জোরদার, খেলাপি ঋণ কমানোর কৌশল, ব্যাংক পুনর্গঠন ও অবসায়ন কার্যক্রমে অর্থায়নের ব্যবস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে আইএমএফ।
এ ছাড়া রাজস্ব আদায় কম হওয়া ও সরকারি ঋণ বেড়ে যাওয়ার কারণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বৃদ্ধি, বিদ্যুতের দাম সমন্বয়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা, ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সরকারি ব্যয় নিয়েও আলোচনা হবে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবসম্মত, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর কার্যকারিতা ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অর্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যয় করা হচ্ছে, সে বিষয়েও জানতে চাইবে আইএমএফ।
সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনাও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা, সরকারি গ্যারান্টি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দায়, বৈদেশিক ঋণের কাঠামো, ভবিষ্যৎ ঋণ ছাড়ের সময়সূচি, পুনঃঅর্থায়নের প্রয়োজন এবং স্বল্প সুদের উন্নয়ন ঋণ ও বাণিজ্যিক ঋণের ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা করবে আইএমএফ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব বৈঠকের মাধ্যমে নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাব্য শর্ত ও অগ্রাধিকার নিয়ে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে সরকারও সাম্প্রতিক কিছু অগ্রগতি তুলে ধরবে। এর মধ্যে রয়েছে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থায় অগ্রগতি, মুদ্রানীতির আধুনিকায়ন, ব্যাংক রেজোল্যুশন ও আমানত সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, ঝুঁকিভিত্তিক ব্যাংক তদারকি, জলবায়ুসংক্রান্ত সংস্কার এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনের উদ্যোগ।
ঢাকা সফর শেষে আইএমএফের প্রতিনিধিদল ওয়াশিংটনে সদর দপ্তরে মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দেবে। সেই মূল্যায়ন ইতিবাচক হলে আগামী অক্টোবরে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার পর নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করতে আরেকটি মিশন ঢাকায় আসতে পারে।
বাংলাদেশ ২০২৩ সালে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। পরে ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এর আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। তবে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থছাড় নিয়ে প্রায় এক বছর আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত সেই অর্থ ছাড় হয়নি। এরপরই নতুন কর্মসূচির দিকে যাচ্ছে উভয় পক্ষ। তবে নতুন কর্মসূচি চালু হলে পুরোনো কর্মসূচি বাতিল হবে।




