চীন যেভাবে সারা বিশ্বের কারখানা

চীন বিশ্বের এক নম্বর গাড়ি উৎপাদন ও ব্যবহারকারী দেশ। ছবি : সংগৃহীত
জনসংখ্যা ১৪২ কোটি, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনবহুল রাষ্ট্র। বিশ্বের এক নম্বর গাড়ি উৎপাদন ও ব্যবহারকারী দেশ। গত বছর ছিল সাড়ে তিন কোটি। দেশটির আয়তন ৯৬ লাখ বর্গকিলোমিটার— পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম দেশ। ২০২৬ সালে সেরা ১০ অর্থনীতির দেশের মধ্যে তারা সেকেন্ড পজিশনে, ২১ ট্রিলিয়ন ডলার। সবচেয়ে দামি ও সহজে বিক্রয়যোগ্য পণ্য স্বর্ণ মজুদের তালিকায় ছয় নম্বরে। মজুদের পরিমাণ ২ হাজার ১৯২ টন। জাতিসংঘ ঘোষিত সারা পৃথিবীর ৩৩ মেগাসিটির মধ্যে চারটি তাদের। এতসব গৌরবময় আর অহংকারী তথ্য দখল করে আছে চীন। এই চীন হলো এখন ‘সারা পৃথিবীর কারখানা’। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকায় ২০২৪ সালে চীনা পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৫০০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ যেমন আমদানিনির্ভর দেশ, তেমনি চীন পণ্য রপ্তানি করে বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থাপনায় শীর্ষে।
প্রায় ১১ বছর পর চীন সফরে এসে এই দেশটির সব সম্ভাবনার সগৌরব উদ্ভাসিত রূপ চোখে পড়ছে। শুনুন সেসব ঘটনা, যাতে আপনার কৌতূহলী মনও আপনাকে ভাবাবে মাতাবে।
বিমানে উঠে দেখা যায়, প্যাসেঞ্জার সব বাংলাদেশি। দলবেঁধে যাচ্ছে চীন। ঘুরতে নয়, বেড়াতে নয়, চিকিৎসাও নয়। তাহলে? সহজ সরল এক শব্দে উত্তর সবার— ‘বিজনেস’। ইমন হোসেন ১৫ বছর ধরে নিয়মিত চীন যাতায়াত করছেন। বড় বড় ভবনে আধুনিক ডিজাইনের লিফট সরবরাহ করেন। তিনি বললেন, ‘আমাদের ব্যবসা চায়নানির্ভর। দাম, কোয়ালিটি, কমিটমেন্ট— সবদিক থেকে ভালো অবস্থানে তারা।’ সেটি কেমন জানতে চাইলাম তার কাছে। দিলেন দারুণ এক উদাহরণ— ‘আমরা যখন কোনো কারখানা ভিজিট করতে যাই, তখন তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আন্তরিকতা মুগ্ধ করে। হোটেলে থাকার ভালো পরিবেশ, হালাল খাবার খাওয়ানো, লেটেস্ট মডেলের গাড়িতে চড়ানো— এসব আয়োজন এত নিখুঁত যে মনে হবে আপনি আপনার শহরে আছেন।’
এই যে এশিয়া মহাদেশের একটি দেশ ধীরে ধীরে বিশ্বের কারখানায় পরিণত হলো, এর ম্যাজিকটা কী? সহজ সরল কোনো থিওরি ছিল না। সরকারের উদার নীতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আর সস্তা শ্রমজীবী মানুষের আন্তরিক অংশগ্রহণ। আমেরিকার মতো ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে জোর করে ধরে নিয়ে আসা কিংবা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি চীনের ক্ষেত্রে।
দেশের একজন শিল্পপতি ও চট্টগ্রাম চেম্বারের প্রেসিডেন্ট আমিরুল হক বললেন, ‘কাউকে একটা গুলি না করেও বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে বসে আছে চীন।’
লিও আর সুসান দম্পতির একাগ্রতার কথা শুনুন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একটা কারখানায় সেলসগার্লের চাকরি নেন। এই সময়ে অনেক বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে সংযোগ ঘটে। ইংরেজি ভালো বলতে পারাটাও তাকে ব্যবসায় বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। লিও করতেন অ্যাপার্টমেন্ট ব্যবসা। সেটি ছেড়ে স্বামী-স্ত্রী মিলে আরও দুই পার্টনারের সঙ্গে গড়ে তুললেন ছোট আকারের কারখানা। একটু কম দামে যারা পণ্য কিনতে চায় তাদের ঠিকানা লিও সুসানের ‘গ্লোবাল ফুজি’। ভালো মানের পণ্য ২০-৩০ শতাংশ কম দামে পাওয়া যাবে এখানে।
সুসান জানালেন, ‘বাংলাদেশ তার বড় বাজার।’ এক ঘণ্টার গাড়ি ড্রাইভের দূরত্বে হাংঝোতে লিফট তৈরির আরেক বড় কারখানা ‘শিজি’। এই ‘শিজি’ ২০১২ সালে আমেরিকার বিখ্যাত ‘ওটিএস’ কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবসা শুরু করে। অত্যাধুনিক এই কারখানায় বছরে উৎপাদন হয় দেড় লাখ লিফট— কার্গো লিফট, এস্কেলেটর। জার্মানির ব্র্যান্ড ‘টি কে ই’ লিফট বানায় তারা। মূল্য সাশ্রয়ের কৌশল। ম্যানেজার জেরেমি বললেন, ‘আমরা কোয়ালিটিতে বেশি মনোযোগী। রাশিয়া, মেক্সিকো, জার্মানির ব্র্যান্ড যায় আমাদের কারখানা থেকে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আমাদের কারখানা পরিদর্শন করেছেন।’
জাহাঙ্গীর আলম বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানে সাপ্লাই করেন জেনারেটর, লিফট ও লাইট। ইউরোপের কারখানা ঘুরেছেন অনেকবার। কিন্তু চীনের অভিজ্ঞতা একদম ভিন্ন তার। মুগ্ধতার যেন শেষ নেই, ‘কারখানা চত্বরে ফলে ভরা গাছ। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। হাই-টেক। সঙ্গে মায়াভরা আতিথেয়তা। আমরা ইউরোপে এরকম আতিথেয়তা কখনো পাইনি। ভবিষ্যতে চীনের কথা মাথায় রেখে ব্যবসা করব।’
১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। মাও সে তুং-এর নেতৃত্বে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি আধুনিক চীন রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয়। তখন তাদের জনসংখ্যা ৫৪ কোটি। মাথাপিছু আয় ছিল ২৩ মার্কিন ডলার। আর এখন ১৫ হাজার ডলার। আজ এই যে উত্থান চীনের, এর পেছনে অন্ধকার গল্পও আছে। চীনে ১৯৫৯ থেকে ৬১ সাল পর্যন্ত মানব ইতিহাসের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারান ১ কোটির বেশি মানুষ। আর বর্তমানে প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের রপ্তানি বাজারে চীনা পণ্যের জয়জয়কার।
হাংঝোও আর সুঝোও শহরে গড়ে ওঠা অসংখ্য কারখানা থেকে পণ্য উৎপাদন হয়ে বড় প্রাইমওভার চলে যাচ্ছে সমুদ্রবন্দরের দিকে। পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনাকে স্বাভাবিক রাখতে বানানো হয়েছে বড় বড় রাস্তা। সেই রাস্তায় নেই যানজট কিংবা খানাখন্দ। পথে চোখে পড়ল ছোট এক গাড়ি দুর্ঘটনা। ১০ মিনিটে পরিষ্কার। মাঝ রাস্তা থেকে দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি সরিয়ে নেয় ট্রাফিক পুলিশ।
চীনের প্রধান বাণিজ্যিক রাজধানী সাংহাই। আড়াই কোটি জনসংখ্যার মেগাসিটিতে অন্যতম সমুদ্রবন্দর। অনেকটা আমাদের চট্টগ্রামের মতো। ট্রাফিক সিগন্যাল পড়লে স্রোতের মতো মানুষের রাস্তা পারাপার। গগনচুম্বী চোখ জুড়ানো ভবন, আধুনিক জীবনধারা, ব্যস্ততম শপিংমল, সড়ক। কোলাহলমুখর, কিন্তু ফুলে-গাছে-সবুজে লাবণ্যময়। কেনাকাটা চলছে ধুমছে। সেখানেও সুন্দরী সেলসগার্লদের লাস্যময়ী হাসি বিদেশি ক্রেতাদের মনোযোগ কাড়ছে। বিদেশ থেকে প্রথম আসা কোনো পর্যটক বিস্ময়ে অবাক হয়ে ভাবতে পারেন সেলসম্যানশিপের অনন্য এ যাত্রা চীনকে বিশ্ব কারখানার আসনে বসাতেও সহায়তা করছে!
সুঁই-সুতা, আলপিন, সেফটিপিন, প্লেট, গ্লাস, কাপড়, পর্দা, সিরামিক, টাইলস, ইলেকট্রিক পণ্য, গার্মেন্টস শিল্পের কাঁচামাল, হালকা মাঝারি মেশিনারি, গাড়ি, ফ্রিজ, এসি, কম্পিউটার, ভারী শিল্পের যন্ত্রপাতি— এসবের হাজার হাজার কারখানা রয়েছে চীনে। সারা বিশ্বের কোটি কোটি ব্যবসায়ী তাই আজ চীনমুখী। ব্যবসাকে তারা পেশাদার শিল্পীর তুলির আঁচড়ে আঁকা পেইন্টিংয়ে উন্নীত করেছে। কত দামে পণ্য কেনার সামর্থ্য রয়েছে আপনার, সেটি তারা আপনার কাছে পৌঁছে দেবে। ধরুন, নেইলকাটার কিনবেন। বাজেট ১০ টাকা। বানিয়ে দেবে। আবার বাজেট ২০ টাকা তাও দেবে। এই যে সারা পৃথিবী থেকে বিমানে চড়ে এত এত মানুষ আসছে তাদের ‘সুরক্ষা শৃঙ্খলার’ ব্যবস্থাপনাও করে রেখেছে নিখুঁতভাবে। বিমানবন্দরে আপনাকে উষ্ণ আতিথেয়তা জানাবে সুদর্শন সুন্দরী নারী-পুরুষ কর্মীরা। এক একটি বিমানবন্দর সাজানো হয়েছে আধুনিক স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে। সবশেষে একটু বলে নেওয়া ভালো, ভাষাগত সমস্যা আছে, আছে টয়লেট ব্যবহারের জটিলতাও। তারপরও কিন্তু পৃথিবী ঝুঁকছে চীনের দিকে।
আহা! জাদুময় স্বপ্নময় এক ‘চীন’।



