স্বস্তি নেই বাজারে

দুই টাকা বাড়িয়ে এ বছর গরুর কাঁচা চামড়ার দর ঢাকার ভিতরে প্রতি বর্গফুট ৬০-৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গ্রামের চামড়া প্রতি ৫৭-৬২ টাকা বর্গফুট। মূল্য না বাড়ার কারণে এবারও কোরবানীর পশুর চামড়াবাজারে বিপর্যয়ের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিগত বছরের চেনা সমস্যাগুলো এবারও বিন্দুমাত্র কমেনি। ফলে আসন্ন ঈদে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, যথাযথ সংরক্ষণ এবং তৃণমূলপর্যায়ে ন্যায্যমূল্যপ্রাপ্তি নিয়ে নতুন করে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের বিপর্যয় ও ধসের আশঙ্কা।
কোরবানির চামড়া মূলত দুটি মাধ্যমে সংগৃহীত হয়— সরাসরি মাঠপর্যায়ের মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন মাদ্রাসা ও এতিমখানা। ঈদের দিন একসঙ্গে বিপুল চামড়া বাজারে আসে। নির্দিষ্ট সময়ে লবণ দিতে না পারলে চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দেন।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার নির্ধারিত লবণযুক্ত চামড়ার দামের কোনো বাস্তব সুফল মাঠপর্যায়ের কোরবানিদাতা বা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা পান না। লাভের সিংহভাগ মূলত চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগী আড়তদার ও সিন্ডিকেটের পকেটে।
কওমি মাদ্রাসা বোর্ড ‘বেফাক’-এর মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক বলেছেন, ‘দেশের মোট চামড়ার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সংগ্রহ করে মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো। এরা ন্যায্যমূল্য না পেলে আগামীতে হয়তো চামড়া সংগ্রহ বন্ধ করে দেবে।’
সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করে ট্যানারি মালিকরা দায় চাপাচ্ছেন আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর। সাভারের আইয়ুব ব্রাদার্স ট্যানারির স্বত্বাধিকারী বেলাল হোসেন জানালেন, ‘২০১৭ সালে যেখানে এক বর্গফুট চামড়া ২ ডলারে বিক্রি করেছি, এখন তা কমে ৫০ সেন্টে নেমেছে। অথচ এ সময় লবণ, কেমিক্যালের দাম ও শ্রমিকের মজুরি দ্বিগুণ হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ট্যানারি টিকে থাকাই কঠিন।’
ন্যায্যমূল্য না পেলে আগামীতে চামড়া সংগ্রহ বন্ধ করে দেব -মাওলানা মাহফুজুল হক মহাসচিব, বেফাক
লেদার ইন্ডাস্ট্রিস ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের সভাপতি সাদাত হোসেন সেলিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘বিগত সময়ে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে চামড়াশিল্প ধ্বংসের মুখে। দীর্ঘদিন ধরে পুঞ্জীভূত এই সংকটের কোনো সমাধান হয়নি।’
চামড়া সংগ্রহের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা ট্যানারি মালিকদের কাছে আড়তদারদের আটকে থাকা কয়েকশ কোটি টাকার বকেয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ সুবিধায় ট্যানারি মালিকরা প্রতি বছর ব্যাংকঋণ পেলেও আড়তদারদের বকেয়া পরিশোধে তাদের নেই কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব টিপু সুলতান বাজারের বিশৃঙ্খল চিত্র তুলে ধরে বলেছেন, ‘ট্যানারি মালিকরা আড়তদারদের বাদ দিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কেনেন, যা বাজারের শৃঙ্খলা নষ্ট করে। তা ছাড়া আড়তদারদের বকেয়া না দেওয়ায় তারা চামড়া কেনার পুঁজি পাচ্ছেন না।
সব ট্যানারি একসঙ্গে চামড়া কিনলে দাম স্থিতিশীল থাকত।’
পোস্তার একজন শীর্ষ ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘ঈদের আগে কিছু বৈঠক আর আশ্বাস ছাড়া কার্যকর উদ্যোগ দেখি না। ট্যানারি টাকা না দিলে আমরা মাঠ থেকে চামড়া কিনব কীভাবে? এবারও আড়তদাররা চামড়া কিনতে না পারলে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া রাস্তায় ফেলে চলে যাবেন।’
পশু জবাই থেকে শুরু করে চামড়া ছাড়ানো এবং সংরক্ষণে দেশে দক্ষ জনবলের তীব্র সংকট রয়েছে। আনাড়ি কসাইদের কারণে চামড়া কেটে গিয়ে গুণগত মান মারাত্মকভাবে কমে যায়। কাঁচা চামড়া সংগ্রহের প্রথম চার থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে লবণ দেওয়া জরুরি হলেও সচেতনতার অভাবে তা হয় না। ফলে প্রতি বছর সম্পূর্ণ নষ্ট হয় প্রায় ৩০ শতাংশ চামড়া।
বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে অবশ্য আশার বাণী শোনাচ্ছেন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি মো. শাহিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, ‘এবার প্রস্তুতি ভালো। চামড়া রক্ষায় সরকার প্রায় ১৮ কোটি টাকার লবণ বিনামূল্যে বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাচার রোধে ও উপজেলাপর্যায়ে সচেতনতার জন্য ৫০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আশা করি, এবার চামড়া ব্যবস্থাপনা ভালো হবে।’
একইভাবে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনজুর হাসান জানালেন, ‘কাঁচা ও ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানির সুযোগ থাকায় এবার চাহিদা ও দাম দুটিই ভালো হবে।’
ব্যবসায়ী নেতাদের একাংশ আশাবাদী হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে যদি এখনই লবণের বাজার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং আড়তদারদের আংশিক বকেয়া পরিশোধের ব্যবস্থা না করা হয়, তবে ২০২৬ সালের কোরবানির ঈদেও দেশের হাজার কোটি টাকার চামড়া সম্পদ অপচয় ও নষ্ট হওয়ার মুখে পড়বে।






