পশুর কাঁচা চামড়ায় অবহেলা

কোরবানির ঈদের পরদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা পশুর চামড়া আসে লালবাগের পোস্তা এলাকার আড়তে। ক্রয়ের আগে চামড়ার মান ও অবস্থা যাচাই করে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। গত শুক্রবার পোস্তা এলাকায়- শামীম-উস-সালেহীন
রপ্তানি আয়ের দ্বিতীয় শীর্ষ খাত, শতভাগ দেশীয় কাঁচামালের জোগান এবং বিপুল কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা— কাগজ-কলমে বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের শক্তি এটিই। তৈরি পোশাক খাতে প্রতি ১০০ ডলার রপ্তানির বিপরীতে প্রায় ৪০ ডলারের কাঁচামাল আমদানি করতে হলেও চামড়াশিল্পে কেমিক্যাল ছাড়া পুরোটাই দেশীয় মূল্য সংযোজন। সবচেয়ে বড় কথা, দেশীয় বাজারে চামড়াজাত পণ্যের যেমন বিশাল চাহিদা রয়েছে, তেমনি বিশ্ববাজারেও প্রতি বছর কাঁচা চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। কিন্তু এক অবিশ্বাস্য বৈপরীত্যের দেশ বাংলাদেশ; যে পণ্যের চাহিদা ও রপ্তানি দুটোই ঊর্ধ্বমুখী, কোরবানির ঈদ এলে তার মূল কাঁচামালই অবহেলায় ফেলে দিতে হচ্ছে নদী কিংবা রাস্তায়!
সারা বছরের মোট চাহিদার প্রায় ৬৫ শতাংশ চামড়া সংগৃহীত হয় কোরবানির মাত্র কয়েক দিনে। অথচ বছরের পর বছর ধরে যথাযথ সংরক্ষণাগারের অভাব, সিন্ডিকেটের থাবা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতায় এই মহামূল্যবান জাতীয় সম্পদ মাটিতে মিশে যাচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, এবারও প্রায় ২০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়েছে, বিশ্ববাজারে যার চাহিদা থাকা সত্ত্বেও দেশের অর্থনীতিতে তা কোনো অবদান রাখতে পারেনি।
বিগত কয়েক বছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চামড়া অবহেলায় ফেলে দেওয়ার বা পানির দরে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ার চিত্র দেখা গেছে। চট্টগ্রামের প্রধান চামড়া সংগ্রহ কেন্দ্র আতুরার ডিপো এলাকায় সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম দরপতনের কারণে ক্ষুব্ধ মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সড়কের পাশে চামড়া ফেলে চলে যান। খুলনায় লবণের খরচ তুলতে ব্যর্থ হয়ে অনেকে রূপসা নদীর পাড়ে ও ব্রিজের নিচে চামড়া ফেলে দেন, এমনকি নদীতে ভাসিয়েও দেওয়া হয়। এ ছাড়া, নাটোর ও রাজশাহীর মধ্যবর্তী এলাকায় পদ্মা-যমুনার শাখানদী এবং মহাসড়কের পাশে দূরদূরান্ত থেকে আনা অবিক্রীত চামড়ার স্তূপ ফেলে যেতে দেখা গেছে।
এক যুগ আগেও চিত্রটি এমন ছিল না। ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত কাঁচা চামড়া ফেলে দেওয়া তো দূরের কথা, মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মধ্যে পাড়া-মহল্লায় চামড়া কেনার প্রতিযোগিতা চলত। মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো চামড়া বিক্রির টাকা দিয়ে তাদের বছরের বড় একটি অংশের খরচ মেটাত। কিন্তু হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিশিল্প সাভারে চামড়াশিল্প নগরীতে স্থানান্তরের পর থেকেই এ খাতে ধস নামতে শুরু করে।
লেদার ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের সভাপতি সাদাত হোসেন সেলিম আগামীর সময়কে বলেছেন, একটি দুষ্টচক্র দেশের চামড়াশিল্পকে ধ্বংস করছে। এই চক্রে কিছু ট্যানারি মালিক এবং আড়তদার আছেন। যারা নিজেরা চামড়া কিনবেন না আবার অন্যকে কিনতেও দিচ্ছেন না। কিছু ব্যাংক এই চক্রে জড়িয়ে পড়েছে। তারা গুটিকয়েক ট্যানারিকে ঋণ দিচ্ছে, যা বাজারে কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না। এই চক্রের কারণে চামড়াশিল্পে নতুন কোনো বিনিয়োগ আসছে না। শিল্পকে বাঁচাতে হলে এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হবে।
এ ছাড়া, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বেঁধে দেওয়া অবাস্তব দামকে অজুহাত বানিয়ে প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ঠকানো হয়। অন্যদিকে, সাভারের ট্যানারিপল্লী আন্তর্জাতিক ‘এলডব্লিউজি’ সনদ না পাওয়ায় পশ্চিমা বাজার হারিয়ে বাংলাদেশ এখন চীনের একচেটিয়া শোষণের শিকার। শেষমেশ, পচনশীল এই পণ্যে ঈদের সময় লবণের কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ও সংরক্ষণের অভাবে কোটি কোটি টাকার চামড়া অবহেলায় নদী-রাস্তায় পচে নষ্ট হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও চামড়া খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্ববাজারের এই ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে লুফে নিতে হলে সবার আগে সাভারের চামড়াশিল্প নগরীকে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব করে এলডাব্লিউজি সনদ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে, কোরবানির চামড়া ব্যবস্থাপনাকে শুধু তিন-চার দিনের মৌসুমি ব্যবসার ওপর ছেড়ে না দিয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কোল্ডস্টোরেজ বা অস্থায়ী সংরক্ষণাগার গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে প্রতি বছর এভাবে কোটি কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ নদী আর রাস্তায় পচে নষ্ট হবে।






