৩৫ হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্সে শুধুই বিলাসী বাড়ি!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দূর থেকে দেখলে মনে হয় একেকটি রাজকীয় প্রাসাদ। পরতে পরতে লেপ্টে আছে কোটি টাকার কারুকাজ। দামি মার্বেল, বিদেশি কাঠ-কাচ আর আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি এসব বাড়ি নজর কাড়ে সহজেই। অথচ বছর জুড়েই এসব অট্টালিকার বেশিরভাগ দরজা-জানালা থাকে বন্ধ।
সিলেট জুড়ে প্রবাসীদের অর্থে গড়ে উঠেছে এমন হাজারো ‘লন্ডনি বাড়ি’। বছরে মাত্র এক-দুই সপ্তাহের জন্য এসব বাড়িতে ফেরে প্রাণ। বাকি সময় জুড়ে শুধুই সুনসান নীরবতা। বিশাল লোহার গেট আর উঁচুতে ঘেরা প্রাচীরের ভেতরে থাকেন শুধুই একজন নিরাপত্তা প্রহরী বা কেয়ারটেকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে সিলেট বিভাগে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ২৮৫ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৩৫ হাজার ১৩৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা (১ মার্কিন ডলার=১২২.৯৮ টাকা)। আর শুধু সিলেট জেলা হিসেবে হিসাব করলে এ অঙ্ক প্রায় ১৫৮ কোটি ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৯ হাজার ৪৩০ কোটি ৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা। রেমিট্যান্স আহরণের দিক থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের পর বিভাগ ও জেলা— দুই হিসাবেই সিলেট রয়েছে দেশের শীর্ষ অবস্থানে। আর এই বিপুল অর্থের বড় একটি অংশ ব্যয় হচ্ছে বিলাসবহুল সব বাড়ি নির্মাণে। তবে কতটা আবাসনে ব্যয় হচ্ছে, তার নেই নির্দিষ্ট কোনো সরকারি পরিসংখ্যান।
সিলেট জুড়েই প্রবাসীদের টাকায় গড়ে উঠেছে চোখধাঁধানো অসংখ্য অট্টালিকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যক্তিগত বিনিয়োগকে সরাসরি অপচয় বলা চলে না। তবে বছরে মাত্র কয়েক সপ্তাহ ব্যবহারের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ এক ধরনের অলস মূলধন। এই অর্থ ব্যবসা, শিল্প বা পর্যটনে খাটানো গেলে অর্থনীতি আরও বেগবান হতো। কারও কারও মতে, কোটি কোটি টাকার অলস মূলধন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকেও বঞ্চিত করছে বড় ধরনের সম্ভাবনা থেকে।
সিলেটের গ্রাম থেকে শহর— যেদিকেই চোখ যায়, চোখে পড়ে দৃষ্টিনন্দন সব বাড়ি। কোনোটি দোতলা, কোনোটি তিনতলা, আবার কোনোটি আয়তন ও নির্মাণশৈলীতে রীতিমতো প্রাসাদ। তবে এসব বাড়ির জাঁকজমকের আড়ালে রয়েছে ভিন্ন এক বাস্তবতা। বছরের বড় একটি সময়ই বাড়িগুলোর দরজা-জানালা বন্ধ থাকে। বিশাল ফটকের ওপারে নেই মানুষের কোলাহল, নেই পারিবারিক বসতি। মালিকরা থাকেন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।
শুধু সিলেট নগর নয়, বিশ্বনাথ, কোম্পানীগঞ্জ, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর, গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারের বিভিন্ন এলাকায়ও রয়েছে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা এমন বাড়ি। অনেক বাড়ির নকশায় রয়েছে লন্ডন কিংবা ইউরোপের আবাসিক ভবনের আদল। বিশাল আঙিনা, বাগান, দামি নির্মাণসামগ্রী ও আধুনিক অন্দরসজ্জায় এসব বাড়ি স্থানীয় অন্যান্য স্থাপনার চেয়ে আলাদা হয়ে ওঠে। তবে উঁচু দেয়াল ও বিশাল লোহার গেটের কারণে বাড়িগুলোর ভেতরের দৃশ্য বাইরের মানুষের চোখে পড়ে না। তারপরও কৌতূহলী মানুষ কখনো কখনো ভিড় করেন বাড়িগুলো দেখতে।
ওসমানীনগরের এমনই একটি দৃষ্টিনন্দন বাড়ি ‘শান্তিনীড়’। লন্ডনপ্রবাসী মোহাম্মদ আব্দুর রব মল্লিকের মালিকানাধীন দোতলা বাড়িটিতে রয়েছে ২০টি কক্ষ। দেশি-বিদেশি কাঠের কারুকাজ, বাড়ির ভেতরের সুইমিং পুল এবং সবুজে ঘেরা পিচঢালা পথ বাড়িটির সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। বাড়িটি দেখতে স্থানীয়দের পাশাপাশি দর্শনার্থীদেরও আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু মালিকের স্থায়ী বসবাস দেশের বাইরে হওয়ায় বছরের বড় সময় এটিও নিয়মিত পারিবারিক আবাস হিসেবে ব্যবহৃত হয় না।
বিয়ানীবাজারের কুড়ারবাজার ইউনিয়নের একটি ‘প্রবাসী বাড়ি’র কেয়ারটেকার হোসেন আলী বললেন, মালিক পরিবার নিয়ে বিদেশে থাকেন। দেশে এলে কিছুদিন বাড়িতে থাকেন। বাকি সময় বাড়ির দেখভালের দায়িত্ব তাদের। তার ভাষায়, মালিকরা দেশে এলে বাড়িতে মানুষজনের আনাগোনা বাড়ে, তখন বাড়িটি জমজমাট থাকে। তারা চলে গেলে আবার নীরব হয়ে যায়।
নগরীর উপশহরের সি-ব্লক এলাকার একটি ‘প্রবাসী বাড়ি’র কেয়ারটেকার খয়রুন বেগম জানালেন, নিয়মিত বাসিন্দা না থাকলেও বাড়ির দেখাশোনা করতে হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, গাছপালা পরিচর্যা এবং কোনো কিছু নষ্ট হয়েছে কি না— এসব নিয়মিত দেখতে হয়।
খয়রুন বলছিলেন, প্রবাসীর বাড়িতে মালিক না থাকলেও অনেক খরচ হয়। তার মতে, বিদ্যুৎ বিল, নিরাপত্তাকর্মী, কেয়ারটেকার, বাগান পরিচর্যা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় মাসে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় হয়। এর বাইরে বছরে রঙ ও মেরামত, সুইমিং পুল, পানির পাম্প, জেনারেটর ও এসি রক্ষণাবেক্ষণে আরও খরচ প্রায় ৬০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ২ লাখ ৫২ হাজার টাকা ব্যয়। এই হিসাবে এমন একটি বাড়িতে একই হারে ১০ বছরে শুধু রক্ষণাবেক্ষণেই খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২৫ লাখ ২০ হাজার টাকা। অবশ্য বাড়ির আকার ও সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী ব্যয় কমবেশি হতে পারে।
দীর্ঘ সময় ফাঁকা থাকার কারণে এসব বাড়ির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম বললেন, প্রবাসীরা এসব বাড়িতে সাধারণত থাকেন না, তাদের মনোনীত তত্ত্বাবধায়করা বাড়ির দেখভাল করেন। সিটিজেন ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফাঁকা বাড়ি দখল কিংবা মালিকানা নিয়ে বিরোধ তৈরির চেষ্টা হতে পারে। এ ধরনের সমস্যা সমাধানে পুলিশের ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম কাজ করছে। অভিযোগ পেলে শুরুতে পারস্পরিক সমঝোতার চেষ্টা করা হয়, সেটি সম্ভব না হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যক্তিগত বাড়ি নির্মাণকে সরাসরি অপচয় বলা ঠিক নয়। তবে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি বাড়ি যদি বছরে কয়েক সপ্তাহ ব্যবহার হয়, তাহলে সেই বিনিয়োগ থেকে নিয়মিত আয় বা কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। একই অর্থ ব্যবসা, শিল্প, পর্যটন কিংবা ভাড়াভিত্তিক আবাসনে বিনিয়োগ করা হলে অর্থনৈতিক সুফল বাড়তে পারে।
যদিও এ বিষয়ে প্রবাসীদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। গোলাপগঞ্জের রনকেলী এলাকার যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাহেল আহমদ বলছিলেন, প্রবাসীদের কাছে দেশে একটি বাড়ি থাকা শুধু বিনিয়োগের বিষয় নয়, এর সঙ্গে আবেগ, পারিবারিক স্মৃতি ও নিজের এলাকার সঙ্গে সম্পর্ক জড়িয়ে থাকে। বিদেশে থাকলেও নিজের এলাকার প্রতি আলাদা টান থেকেই সামর্থ্য অনুযায়ী অনেকে বড় বাড়ি নির্মাণ করেন।
সিলেট জুড়ে ঠিক কতগুলো এমন বিলাসবহুল প্রবাসী বাড়ি রয়েছে, তার নেই নির্ভরযোগ্য কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান। তবে বিশ্বনাথ থেকে বিয়ানীবাজার, ওসমানীনগর থেকে গোলাপগঞ্জ— বিভিন্ন এলাকায় এমন বাড়ির উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। উপযুক্ত অবস্থানের কিছু বাড়ি প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে গেস্ট হাউজ, বুটিক হোটেল, রিসোর্ট কিংবা ভাড়াভিত্তিক আবাসনে ব্যবহার করা গেলে মালিকের আয় যেমন তৈরি হতে পারে, তেমনি স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান বললেন, ‘সিলেটে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আসছে। এই অর্থের কত অংশ বাড়িঘর, জমি, ব্যবসা কিংবা অন্য কোনো খাতে যাচ্ছে, তার খাতভিত্তিক নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান আমাদের হাতে নেই। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, প্রবাসীদের একটি অংশ দেশে এসে মূলত বাড়িঘর নির্মাণ ও জমিতে বিনিয়োগ করেন। তবে সিলেট জেলার বছরে আসা প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্সের ২০ শতাংশও যদি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা সম্ভব হয়, তাহলে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ তৈরি হতে পারে। এতে নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব। এটি সিলেটের জন্য বড় একটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।’
সিলেটে প্রবাসীদের পাঠানো বিপুল রেমিট্যান্স স্থানীয় অর্থনীতির জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, ব্যক্তিগত সম্পদ— বিশেষ করে বাড়িঘর নির্মাণের পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো গেলে এই অর্থের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি সৃষ্টি হতে পারে বড় পরিসরে কর্মসংস্থানের সুযোগ। এজন্য প্রবাসীবান্ধব বিনিয়োগ পরিবেশ, শিল্প অবকাঠামো, সহজ অর্থায়ন, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন তারা।
সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি খায়রুল হোসেনের মতে, রেমিট্যান্সকে শিল্প বিনিয়োগে নিয়ে আসার সবচেয়ে বড় শর্ত হলো প্রবাসীদের জন্য আস্থাশীল ও নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা। সিলেটে যদি শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি, বিদ্যুৎ-গ্যাস, অবকাঠামো, সহজ অর্থায়ন এবং ওয়ান-স্টপ সেবা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে প্রবাসীদের অর্থের একটি অংশ শিল্প ও ব্যবসায় আসতে পারে।
‘প্রবাসীদের অর্থ আছে, উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতাও আছে, প্রয়োজন শুধু বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ। ধরা যাক, ১০ শতাংশ উৎপাদনশীল খাত বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ করা হয়, তাহলে শুধু সিলেট জেলার ১৫৮ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স থেকে বছরে প্রায় ৪ হাজার শিল্প-উদ্যোগ গড়ে তোলা সম্ভব। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে গড়ে ৩০-৫০ জনের কর্মসংস্থান হলেও সরাসরি ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে’— যোগ করলেন চেম্বার সভাপতি।
রেমিট্যান্সকে শুধু বড় শিল্পে বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যেতে পারে বলে মনে করেন সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি লুবানা ইয়াছমিন শম্পা। বললেন, ‘প্রবাসী পরিবারের সদস্যদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে এই অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখতে পারে। রেমিট্যান্সের একটি অংশ যদি ক্ষুদ্র ব্যবসা, নারী উদ্যোক্তা, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, পর্যটন ও সেবা খাতে বিনিয়োগ হয়, তাহলে হাজার হাজার নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।’



