কৃষি ছেড়ে ‘ভয়ংকর তান্ত্রিক’ তারা, হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা

ছবি: আগামীর সময়
রাত গভীর হলেই লাল-সাদা কাপড়ে বেরিয়ে পড়েন একদল যুবক। নির্জন বাগান বা বনজঙ্গলে তৈরি করেন তান্ত্রিক সেজে শুটিংয়ের আসন। গাছে গাছে আগুন, মাটির হাঁড়িতে ধোঁয়া, চারপাশে মোমবাতি প্রজ্বালন। এভাবে তৈরি করা হয় ভৌতিক পরিবেশ। এরপর চলে ‘জিন হাজির করার দৃশ্যের’ অভিনয়। লম্বা চুল ও দাড়ির সঙ্গে অসংলগ্ন জামাকাপড় দেখিয়ে এবং নানা অঙ্গভঙ্গিতে তৈরি করা হয় ভীতিকর ভিডিও। সেগুলো ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে ফাঁদ পাতেন প্রতারকরা। সেই ভিডিও দেখে সহজেই বিশ্বাস করেন সহজ-সরল প্রবাসী ও দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জটিল রোগে ভোগা রোগীরা। এরপর নানা অজুহাতে দফায় দফায় হাতানো হয় লাখ লাখ টাকা। এটি নাটোরের বড়াইগ্রামের একটি মহল্লার নিয়মিত চিত্র।
উপজেলার চৌমহন গ্রামেই অন্তত ৩৭ জন কথিত তান্ত্রিকের সন্ধান পাওয়া গেছে। তাদের রয়েছে দুই শতাধিক সহযোগী। পাশের গ্রাম কুশমাইল ও সংগ্রামপুরে আছে আরও ৮-১০ জন প্রতারক। তাদের প্রতারণার ফাঁদে পড়েন শত শত প্রবাসী। তাদের বিশ্বাস করে টাকা দেওয়ার পর সুফল না েপয়ে থানায় অভিযোগ করেছেন বেশ কয়েকজন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১৯ সেপ্টেম্বর সোহান, সোহাগসহ চার কথিত তান্ত্রিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
কয়েক মাস আগে ওই এলাকায় যৌথ অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তখন আস্তানা ছেড়ে পালিয়ে যান কথিত তান্ত্রিকরা। এরপর তাদের প্রতারণা কিছুদিন বন্ধ থাকলেও আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে এই চক্র।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, অদ্ভুত কণ্ঠ ও ভয়ংকর দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে কালো জাদু দূরীকরণ, রোগমুক্তি, ভাগ্য পরিবর্তনসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে প্রচার করা হচ্ছে ভৌতিক ভিডিও। এগুলো দেখে ফাঁদে পড়ছেন সহজ-সরল মানুষ। প্রবাসীরা ‘অলৌকিক ক্ষমতার’ ভিডিও দেখে পরিবারের ওপরে থাকা কথিত অশুভ শক্তির প্রভাবসহ বিভিন্ন সমস্যা দূর করতে যোগাযোগ করেন কথিত কবিরাজদের সঙ্গে। এরপর রোগমুক্তির আশ্বাসে মোবাইল ফোনে দেওয়া হয় প্রতিশ্রুতি। প্রথমে জিন হাজির করার কথা বলে রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নেওয়া হয় ২০০-৩০০ টাকা। এরপর চিকিৎসার নানা প্রলোভনে ধাপে ধাপে বাড়াতে থাকে টাকার পরিমাণ। একপর্যায়ে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয় লাখ লাখ টাকা।
ভুক্তভোগী পাবনার তোফাজ্জল হোসেন জানালেন, সমস্যা সমাধানের আশ্বাসে কথিত তান্ত্রিক মো. সোহান, মো. সোহাগ ও সাব্বির আহম্মেদ সাবু বিভিন্ন কৌশলে ধাপে ধাপে তার কাছ থেকে টাকা নিতে থাকেন। কয়েক মাসে ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে নেন তারা। প্রতারণা বুঝতে পেরে টাকা উদ্ধারে তাদের বাড়িতে গেলে উল্টো বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখানোর পাশাপাশি দেওয়া হয় প্রাণনাশের হুমকি। পরে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হয় থানায়।
‘আমার অসুস্থ মেয়ে অনেক চিকিৎসার পরও সুস্থ না হওয়ায় ইউটিউবে ভিডিও দেখে ওই তান্ত্রিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাদের মধ্যে ইমরান মেয়েকে সুস্থ করে দেওয়ার প্রলোভনে দেড় লাখ টাকা নেন। কিন্তু দীর্ঘদিন পরও স্বাস্থ্যের উন্নতির পরিবর্তে উল্টো অবনতি হওয়ায় ফেরত চাই টাকা। এবার জিনের মাধ্যমে ক্ষতি করার ভয় দেখানো হয়। এমনকি বাড়ি থেকে উঠিয়ে আনার হুমকিও দেন তারা। থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েও মেলেনি সুফল’— বলছিলেন প্রতারণার শিকার সৌদি আরবপ্রবাসী দয়াল খান।
স্থানীয়রা বললেন, কথিত এই তান্ত্রিকরা একসময় কৃষি বা শ্রমিকের কাজ করতেন। হঠাৎ করে অনেকেই এখন বিপুল সম্পদের মালিক। কেউ কেউ তিন-চারতলা ভবনও নির্মাণ করেছেন। রয়েছে একাধিক গাড়িসহ বিপুল অর্থসম্পদ। সম্মানজনক কাজ ছেড়ে এভাবে মানুষকে ঠকানোর কারণ জানতে চাইলে প্রতারণার কথা স্বীকার করলেন কথিত তান্ত্রিকজীবন। তিনি বললেন, ‘এটি করা ঠিক না। সবাই যেভাবে ইউটিউব চ্যানেল খুলেছিল, আমিও খোলার চেষ্টা করছিলাম। যেহেতু বাধা-বিপদ, এ পথে আমি আর এগোব না।’
যৌথ অভিযানে কথিত এই তান্ত্রিকদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা হয়েছিল বলে দাবি নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতে খায়েরের। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, এর আগে প্রতারকদের বিরুদ্ধে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাদের কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেয়। আবার যদি তারা নতুন করে অপকর্ম শুরু করে বা মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে তাহলে বড় পরিসরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চালানো হবে। তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে সচেতন হতে হবে সাধারণ মানুষকেও। না জেনেবুঝে কাউকে টাকা দেওয়া যাবে না।





