৬০ টাকার বোট ভাড়া, ঘাটেই টোল ১০০

কক্সবাজারের বোট ঘাট— সংগৃহীত
মহেশখালী-কক্সবাজার নৌপথে বোটে আসা-যাওয়ার ভাড়া যেখানে ৬০ টাকা, সেখানে শুধু ঘাট ব্যবহারের জন্য একজন দেশীয় পর্যটককে দিতে হচ্ছে ১০০ টাকা। বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে একই পথে আদায় করা হচ্ছে ৬০০ টাকা। অথচ টোলের বিপরীতে ঘাটে নেই পর্যাপ্ত যাত্রীসেবা। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভ বাড়ছে পর্যটক ও স্থানীয়দের মধ্যে।
কক্সবাজারের বাঁকখালী, নুনিয়াছড়া ও মহেশখালী ঘাটে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নির্ধারিত টোল আদায় নিয়ে এমন অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ এটিকে বৈষম্যমূলক টোল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিআইডব্লিউটিএর নির্ধারিত ফি অনুযায়ী, মহেশখালী ভ্রমণে আসা-যাওয়ার সময় একজন দেশীয় পর্যটকের কাছ থেকে প্রবেশ ও ফেরার জন্য ৫০ টাকা করে মোট ১০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ বোটের ভাড়া ৬০ টাকা হলেও ঘাটের টোলই গুনতে হচ্ছে তার চেয়ে বেশি।
অন্যদিকে বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে আসা-যাওয়ার জন্য মোট ৬০০ টাকা টোল আদায় করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে নেওয়া হচ্ছে মাত্র ৫ টাকা।
কক্সবাজার ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রেজাউল করিমের অভিযোগ, ঘাট ব্যবহারের জন্য তুলনামূলক বেশি টোল নেওয়া হলেও যাত্রীদের জন্য ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি।
তার ভাষ্য, ঘাটে নারী, শিশু ও বয়স্কদের বসার বা বিশ্রামের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। নেই সুপেয় পানি ও মানসম্মত শৌচাগার। ফলে টোলের বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ায় পর্যটকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে যাতায়াতে ৬০০ টাকা নেওয়া হলেও তাদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো, নিরাপত্তা বা বাড়তি কোনো সুবিধা নেই বলেও অভিযোগ করেন এই পর্যটন ব্যবসায়ী।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেছেন, একই দেশের নাগরিক হয়েও শুধু অন্য জেলা থেকে বেড়াতে আসার কারণে স্থানীয়দের তুলনায় অনেক বেশি টোল দিতে হচ্ছে— এমন অভিযোগ রয়েছে।
তার ভাষ্য, কে স্থানীয় আর কে পর্যটক— তা নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না থাকায় ঘাটের ইজারাদারের লোকজনের সঙ্গে যাত্রীদের বাগবিতণ্ডা ও হয়রানির ঘটনাও ঘটছে। এমনকি কাজের প্রয়োজনে প্রতিদিন মহেশখালী-কক্সবাজার নৌপথে যাতায়াতকারী শ্রমজীবী মানুষকেও অনেক সময় পর্যটক আখ্যা দিয়ে ৫০ টাকা টোল দিতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ঘাট ব্যবহারকারী পর্যটক আব্দুল্লাহ, সাঈদ ও ইসমাইল বললেন, ‘ঘাটে তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। আসা-যাওয়ার জন্য ১০০ টাকা টোল দিয়েও নোংরা পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।’
মহেশখালীর স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিনের ভাষায়, নৌপথে যাতায়াতের বোট ভাড়া যেখানে ৩০ টাকা করে, সেখানে টোল বাবদ ১০০ টাকা নেওয়া অস্বাভাবিক। এমন চড়া টোলের কারণে ভবিষ্যতে পর্যটকেরা মহেশখালী ভ্রমণে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
চলতি মাস থেকে বিআইডব্লিউটিএর ঘাট ব্যবহার করে মহেশখালী যাতায়াতের ক্ষেত্রে দেশীয় পর্যটকদের কাছ থেকে ১০০ টাকা এবং বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে ৬০০ টাকা টোল আদায়ের বিষয়টি জানতে পেরেছেন বিআইডব্লিউটিএর কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিবহন (নৌ) পরিদর্শক মো. জসিম উদ্দিন।
তিনি বলেছেন, ‘এটা সঠিক সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি ইতোমধ্যে বিআইডব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেছি। সরকারি গেজেট অনুযায়ী নির্ধারিত টোলের হার পর্যালোচনা করে শিগগিরই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিমও ঘাটে অতিরিক্ত টোল আদায়ের বিষয়টি অবগত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, ঘাট নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে বিআইডব্লিউটিএ। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে।
তারা জানিয়েছেন, টোল নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের। মহেশখালী-কক্সবাজার নৌপথ কেবল পর্যটকদের জন্য নয়, স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফলে ঘাট ব্যবহারের টোল ও যাত্রীসেবার মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে এর প্রভাব পর্যটনের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের ওপরও পড়বে বলে মনে করছেন কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা।
তার দাবি, টোল আদায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঘাটে নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য বসার ব্যবস্থা, সুপেয় পানি, পরিচ্ছন্ন শৌচাগারসহ প্রয়োজনীয় যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে একই দেশের নাগরিকদের মধ্যে টোলের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করে যৌক্তিক হার নির্ধারণে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএকে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।





