‘সরতে হবে শিক্ষামন্ত্রীকে’— বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডের সামনে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। ছবি: আগামীর সময়
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। তুলেছেন পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্রে ভুল ও অতিরিক্ত কঠিন প্রশ্নের অভিযোগও। আর এসবের দায়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ চাইছেন তারা।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় সড়ক অবরোধ, সমাবেশ ও মিছিল করেছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। কয়েক জেলায় আন্দোলনের কারণে সড়কে বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বন্যা ও জলাবদ্ধতার মধ্যে কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি অনেক পরীক্ষার্থী। এরপরও স্থগিত করা হয়নি পরীক্ষা। পাশাপাশি পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্রে ভুল এবং প্রশ্ন ছিল অতিরিক্ত কঠিন।
সারা দেশে একই সময়ে পরীক্ষা নেওয়া, দুর্যোগের কারণে অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীদের ফের পরীক্ষার সুযোগ, ক্ষতিগ্রস্ত প্রবেশপত্র ও নিবন্ধন কার্ড দ্রুত সরবরাহ এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানান তারা।
রাজশাহীতে শিক্ষা বোর্ডের সামনে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীদের একটি প্রতিনিধিদল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরীর কাছে স্মারকলিপি দেয়।
চেয়ারম্যান জানান, শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে জানানো হবে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়ই নেবে।
বগুড়ায় শহরের সাতমাথায় দফায় দফায় সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্মারকলিপি দিয়ে আবারও সাতমাথায় ফিরে অবরোধ শুরু করেন। অন্যান্য দাবির পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিও চেয়েছেন তারা।
প্রায় এক ঘণ্টা পর বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন ও জেলা বিএনপির নেতারা আসেন ঘটনাস্থলে। সমস্যা সমাধানে তাদের আশ্বাসের পর সড়ক ছেড়ে সরে যান শিক্ষার্থীরা।
বরিশালে শিক্ষা বোর্ডের সামনে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করলে দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। একইভাবে কুমিল্লায় কান্দিরপাড় থেকে মিছিল নিয়ে শিক্ষা বোর্ডে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা।
চট্টগ্রামে শিক্ষা বোর্ডের সামনে সড়ক অবরোধ করেন পরীক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, কোনো বোর্ডে পরীক্ষা স্থগিত রেখে অন্য বোর্ডে পরীক্ষা নেওয়া যাবে না। দুর্যোগে যারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, তাদের আবার পরীক্ষার সুযোগ দিতে হবে। তবে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি শোনা যায়নি তাদের মুখে।
নওগাঁও আজ দুপুরে জেলা শিক্ষাভবনের সামনে ‘এইচএসসি ২০২৬ ব্যাচ’-এর ব্যানারে আয়োজিত হয় বিক্ষোভ কর্মসূচি। মানববন্ধন থেকে দেওয়া হয় হুঁশিয়ারি- দাবি পূরণ না হলে আগামী ১৮ জুলাই নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রীর আগমন ঠেকাতে আসবে কঠোর কর্মসূচি।
এদিকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ সাত দাবিতে সিলেট নগরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। আজ মঙ্গলবার দুপুরে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে তারা এই কর্মসূচি পালন করেন। পরে মিছিল নিয়ে নগরের কোর্ট পয়েন্টে গিয়ে সাত দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
এদিক দুপুরে ‘শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি’ লেখা ব্যানার নিয়ে তারা সড়কে অবস্থান নেন। এক পর্যায়ে তারা নগরের জিন্দাবাজার হয়ে কোর্ট পয়েন্টে গিয়ে কর্মসূচি শেষ করেন। এ সময় সাত দফা উত্থাপন করে তারা জানান, অবিলম্বে দাবিগুলো মানা না হলে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
দাবিগুলো হচ্ছে ১. ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ; ২. দেশের বন্যা ও বৈরী আবহাওয়ার পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এইচএসসি ও সমমানের সব পরীক্ষা স্থগিত রাখতে হবে; ৩. খারাপ আবহাওয়া ও বন্যার কারণে যেসব শিক্ষার্থী ১৩ জুলাইয়ের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি, তাদের জন্য পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দিতে হবে; ৪. পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুলের জন্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের যথাযথ নম্বর প্রদান করতে হবে; ৫. শিক্ষার্থীদের সারা বছরের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী প্রশ্নপত্র তৈরি করতে হবে এবং পরীক্ষার সময় প্রশ্নপত্রের মান ও ভুল সংশোধনে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; ৬. আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কোনো প্রকার আইনি বা প্রশাসনিক হয়রানি না করার নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং ৭. শিক্ষা ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে এবং হুট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও পরীক্ষা নিয়ে যেকোনো ধরনের 'গবেষণা' বা অহেতুক পরিবর্তন বন্ধ করতে হবে।
ময়মনসিংহে টাউন হল এলাকায় ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করলে থেমে যায় যান চলাচল। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আসাদুজ্জামান শাকিল বলেছেন, শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
আজ দুপুর ১টার দিকে দিনাজপুর শহরের ফুলবাড়ী বাসস্ট্যান্ড মহাসড়ক আটকে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। ওই এলাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। বিকাল সাড়ে ৩টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত চলছে তাদের কর্মসূচি।
ফরিদপুরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেন পাঁচ দফা দাবিতে। আজ দুপুর ১২টার দিকে শহরের ফরিদপুর প্রেস ক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত হয় এই কর্মসূচি। তাদের দাবির মধ্যেও আছে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত ও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ।
কুমিল্লা নগরীর পূবালী চত্বরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সমাবেশে করেন। পরে তারা ব্যানার-ফেস্টুন হাতে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বিভিন্ন দাবিতে স্লোগান দিয়ে নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনে জড়ো হন। সেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর মো. জাহাঙ্গীর আলম।
শিক্ষার্থীরা জানান , টানা বৃষ্টি, বন্যা পরিস্থিতি ও নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে সময়মত পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে পৌঁছাতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। অনেকে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারছে না। এতে তারা পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি মানসিক চাপেরও সম্মুখীন হচ্ছেন। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরবর্তী এইচএসসি পরীক্ষাগুলো স্থগিত করার দাবি জানান তারা।
কুমিল্লা মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম আগামীর সময়কে বললেন, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা পিছানোর দাবি নিয়ে বোর্ডের সামনে এসেছিল। তাদের কথা শুনে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জানানো হবে।
টাঙ্গাইলে গতকালের এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে টাঙ্গাইলে বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। এ সময় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক প্রায় ১০ কিলোমিটার যানজট সৃষ্টি হয়।
দুপুরে দেড়টা থেকে শিক্ষার্থীরা প্রায় দেড় ঘণ্টা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন। এতে মহাসড়কের উত্তরবঙ্গগামী লেনে ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
এর আগে সকালে টাঙ্গাইল প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে পরীক্ষার্থীরা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের ডাক ছড়িয়ে পড়ার পর সোমবার থেকে বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি শুরু হয়। মঙ্গলবার তা আরও বিস্তৃত হয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।
সকালে রাজধানীতে আন্দোলন শুরু হয় সায়েন্স ল্যাব মোড় থেকে। পরে উত্তরা ও মিরপুরের রাস্তায় দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। উত্তরা বিএনএস সেন্টারের সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন বিভিন্ন কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা। পরে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরের দিকে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। এরপর তারা নীলক্ষেত থেকে টিএসসিগামী সড়কে অবস্থান নেন।
ঢাকা সিটি কলেজ, ঢাকা কলেজ, ঢাকা আইডিয়াল কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ, বিএফ শাহীন কলেজসহ কর্মসূচিতে অংশ নেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।
[সারা দেশ থেকে আগামীর সময় প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন থেকে নেওয়া]








