পাইকগাছা-কয়রা সড়ক উন্নয়ন
২ বছরের কাজ শেষ হয়নি ৬ বছরেও

ছবি: আগামীর সময়
সাতক্ষীরার তালা থেকে খুলনার পাইকগাছা-কয়রা পর্যন্ত যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সড়ক প্রশস্ত ও বাঁক সরলীকরণ কাজে দেখা দিয়েছে জনভোগান্তি। ৫৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক উন্নয়ন কাজটি চারবার সময় বাড়ালেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এখনো শেষ করতে পারেনি।
সর্বশেষ সময় অনুযায়ী চলতি জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও ২০ শতাংশ কাজ এখনো বাকি। নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন করা নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। এখনো চলছে কয়েক জায়গায় বাঁক সোজা করার প্রাথমিক কাজ।
তবে চলমান কপিলমুনি ফকিরবাসা ও পাইকগাছা গোলাবাটি বাঁকের বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা জমি অধিগ্রহণের টাকা পরিশোধ না করার অভিযোগ করেছেন।
তালার আঠারো মাইল থেকে খুলনার কয়রা পর্যন্ত জনসাধারণের চলাচলের পথ নির্বিঘ্ন ও ঝুঁকিমুক্ত করতে ২০২০ সালে সড়ক ও জনপথ বিভাগ 'বাঁক সরলীকরণ ও সড়ক প্রশস্তকরণ' এ প্রকল্পটি হাতে নেয়। এর মধ্যে ১০০ মিটার নদীশাসনের কাজও রাখা হয়েছে প্রকল্পে।
স্থানীয়রা বলেছেন, যত দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, ততবার ব্যয়ও বেড়েছে। মানুষের চলাচলে যে অসহনীয় ভোগান্তি সেটা কবে লাঘব হবে তা কেউ জানে না। কাজটি সম্পন্ন করতে এতদিন লাগার কথা না।
খুলনা সড়ক ও জনপথ (সওজ) দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২১ জানুয়ারি তালা-কয়রা ভায়া পাইকগাছা সড়ক উন্নতীকরণ প্রকল্পটি একনেকে পাস হয়। দরপত্র শেষে কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোজাহার এন্টারপ্রাইজ। ২৯ ডিসেম্বর তাদের ৩৩৯ কোটি ৫৮ লাখ ৪৭ হাজার টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ২০২২ সালের ৩০ জুন কাজ শেষ করার কথা ছিল। পরবর্তী সময়ে নানা জটিলতার কারণে চার দফা এক বছর করে সময় বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩০ জুন করা হয়। প্রকল্পে ব্যয় বাড়ানো হয় ৪০ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রকল্পের মধ্য থেকে তিন কিলোমিটার অংশের জন্য আলাদা করে ব্যয় বাড়ানো হয় আরও ৫৫ কোটি টাকা। সর্বশেষ তালা থেকে পাইকগাছা পর্যন্ত ৬৫ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে ছয় ফুট প্রশস্ত করার জন্য বরাদ্দ করা হয় আরও ১০০ কোটি টাকা। এভাবে প্রকল্পের ব্যয় ১৯৫ কোটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৩৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের আঠারোমাইল (বেতগ্রাম) থেকে তালা উপজেলার মধ্যের কাজ অনেকাংশে সম্পন্ন হয়েছে। তবে বাঁক সরলীকরণের জন্য জমি অধিগ্রহণের জটিলতায় দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকার পর গত ৬ জুন থেকে পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি বাজারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন বাঁক সরলীকরণের কাজ শুরু করছেন। বাজারের ফকিরবাসা মোড় ও গোলাবাটি মোড়ে বুলডোজারের মাধ্যমে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে পাকা বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। বাদ যায়নি মাদ্রাসাও।
জমির মালিক শেখ সেকেন্দার আলী, দীপংকর সাহা, শেখ বাবর আলী, শিমুল সরদার, জামাল হোসেন, শাহিনুর রহমানের ভাষ্য, তাদের বিল্ডিংবাড়ি, দোকানপাট অবৈধভাবে প্রশাসন দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। জমি অধিগ্রহণের টাকা পরিশোধ না করে জেলা প্রশাসক ও সওজ তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। এর আগে একই অভিযোগে তারা গত বছর একবার বাঁক সরলীকরণ কাজে বাধা দিলে খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় একাধিকবার মীমাংসার উদ্যোগ নেয়। কথা হয় টাকা পরিশোধ করেই কাজ করার। কিন্তু তাদের কথা তারা না রেখেই আমাদের সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে। আমরা কোথায় গেলে এর সুষ্ঠ বিচার পাব?
ট্রাকচালক হায়দার আলী জানান, বেতগ্রাম থেকে পাইকগাছা শিবসা সেতুর দক্ষিণ পাশের সংযোগ সড়ক, কপিলমুনি বাজার, গদাইপুর, পাইকগাছা বাসস্ট্যান্ড, আলমতলা ও গজালিয়া কালভার্ট, কয়রার হাতিয়ারডাঙ্গা, আমাদি বাজার এলাকায় কাজ অসম্পন্ন রয়েছে। এসব এলাকার সড়ক কাদাপানিতে একাকার। বাঁকগুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। পথচারীসহ যানচলাচলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
পথচারী মনিরুজ্জামান মনির ভাষ্য, বর্ষায় কাদাপানি আর গরমে ধুলাবালিতে সাধারণ মানুষ চরম নাজেহাল হচ্ছে। যানচলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের চলাচলে চরম সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে হাসপাতালে যেতে রোগীদের কঠিন ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে। চলতি মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে তিনি সন্দেহ পোষণ করেন।
সওজের এক কর্মকর্তা জানালেন, সড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক সোজা করা। এতে ১১.২৪ হেক্টর জমি অধিগ্রহণে ৭১ কোটি ৮২ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় শুরু থেকেই কপিলমুনিতে ১টি, গোলাবাটিতে ১টি, গোপালপুরে ১টি,গজালিয়ায় ৩টি, মৌখালী ৩টি, মদিনাবাদে ১টিসহ মোট ১০টি পয়েন্টে ভূমি মালিকদের অধিগ্রহণের টাকা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে এখনো পরিশোধ করা হয়নি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কয়রা উপজেলা শাখার সভাপতি মোস্তফা শফিকুল ইসলামের মতে, কয়রা থেকে খুলনা যাতায়াতের জন্য একমাত্র সড়কটির উন্নয়নকাজ শুরু হলে এলাকাবাসীর মনে স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু সড়কের কাজের দুরবস্থা দেখে সে স্বস্তি এখন অস্বস্তিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান সড়কের দুই থেকে তিন কিলোমিটার পরপর নাজুক অবস্থায় পড়ে আছে।
পাইকগাছা নাগরিক কমিটির সভাপতি মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর জানালেন, সড়কে সেই আগের দুর্ভোগ থেকেই গেছে। সড়কের বাঁকে বাঁকে দুর্ভোগ লেগেই আছে। এতদিন জমি অধিগ্রহণের জটিলতার কথা বলা হলেও এখন দেখছি টাকা ছাড় না দিয়ে তারা বাড়িঘর দোকানপাট ভেঙে বাঁক সোজা করছে।
মোজাহার এন্টারপ্রাইজের প্রকল্প ব্যবস্থাপক রাজন আহমেদের ভাষ্য, প্রকল্পের ৩০টি বাঁক সরলীকরণের জন্য জমি অধিগ্রহণে সময়ক্ষেপণ হয়েছে। সড়কটির কাজে সওজের প্রকৌশলীদের নির্দেশনা মেনে এবং প্রাক্কলন অনুসরণ করা হচ্ছে। তারপরও কাজ করতে গেলে টুকটাক সমস্যা হয়। চলমান কাজে যেসব স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেই স্থানও ঠিক করে দেওয়া হবে।
খুলনা সড়ক ও জনপথের (সওজ) সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো তানিমুল হক জানান, ২০২০ সালে বেতগ্রাম থেকে কয়রা পর্যন্ত প্রায় ৬৫ কিলোমিটার সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো সরলীকরণ ও প্রশস্তকরণের মেগা প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। সাতক্ষীরার তালা অংশের কাজ অনেকটা শেষ হলেও পাইকগাছা ও কয়রা অংশের ১০টি পয়েন্টের বাঁক সরলীকরণের কাজ এখনো অসমাপ্ত।
ভূমি মালিকরা গত বছর ডিসেম্বরে ক্ষতিপূরণের টাকা না পেয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল। অধিগ্রহণের জমির টাকা চেক প্রস্তুত থাকলেও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর না হওয়ায় টাকা দিতে দেরি হচ্ছে। ৬ জুন থেকে সড়কের কাজ আবার শুরু হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে তিনিও সংশয় প্রকাশ করেছেন।




