কাজ সমান মজুরি অর্ধেক

ছবি: আগামীর সময়
বীজতলা থেকে তুলে জমিতে রোপণ করার সময় ধানের চারা বুঝতে পারে না, কাজটি নারী করছেন না পুরুষ। আবার পাকা ধান কাটার সঙ্গে নারী বা পুরুষ হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ, লিঙ্গভেদে যে কেউ এ কাজ করতে পারেন। তাতে ফল একই আসবে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এসব কাজ করার জন্য নারী যে মজুরি পান, পুরুষ পান এর দ্বিগুণ।
যৌক্তিক কোনো কারণ না থাকলেও সাতক্ষীরার শ্যামনগরে নারী-পুরুষের মজুরি কাঠামোতে এমন বৈষম্য দেখা গেল। আর এটি যে শুধু ধান কাটা বা এ-সংক্রান্ত কাজেই ঘটছে, তা নয়। বেশিরভাগ শ্রমনির্ভর কাজেই সমান কাজ করেও মজুরি পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকছেন নারী।
এমন একসময়ে নারী-পুরুষের মজুরিতে এই ভেদাভেদ চলছে, যখন বিশ্বের নারীরা চাঁদে যাচ্ছেন, শুধু পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নয়, কখনো পুরুষের অগ্রগামী হয়ে করছেন আবিষ্কার, সাগর সেঁচে নিয়ে আসছেন মুক্তো, অংশ নিচ্ছেন সম্মুখযুদ্ধে, বুদ্ধির খেলায় হারিয়ে দিচ্ছেন শত্রুকে, পরাজিত করছেন রোগ-শোক-দুঃখ-জরাকে।
কিন্তু বাংলাদেশের কোথাও কোথাও, তারা ঠিকই রয়ে যাচ্ছেন অবহেলিত-পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অংশ।
কৃষিকাজে নিয়োজিত শ্যামনগরের স্থানীয় শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল, পুরুষ শ্রমিকরা দৈনিক ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান। একই সময় ও একই কাজের জন্য নারীরা পান ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, যা পুরুষের আয়ের অর্ধেক।
উপজেলার মুন্সীগঞ্জ, ঈশ্বরীপুর, কৈখালী ও ভুরুলিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেল, ধানক্ষেত থেকে শুরু করে কাঁকড়া খামার, মাছের ঘের, নদীতে রেণু আহরণ, এমনকি রাস্তা নির্মাণকাজেও পুরুষের পাশাপাশি কাজ করছেন নারীরা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোদে পুড়ে, কাদা-মাটিতে ভিজে তারা দিন পার করেন। কিন্তু দিনের শেষে হিসাব মেলে না।
কথা হলো স্থানীয় কয়েকজন নারী শ্রমিকের সঙ্গে। তারা বলছিলেন, কাজের ধরন, পরিমাণ ও সময় এক হলেও শুধু নারী হওয়ার কারণে তারা কম মজুরি পাচ্ছেন। কিন্তু বিকল্প আয়ের সুযোগ না থাকায়, অনেকটা বাধ্য হয়েই এই বৈষম্য মেনে নিতে হচ্ছে তাদের। আর বিষয়টি তাদের জন্য নতুনও নয়, বছরের পর বছর ধরে এভাবেই পুরুষের চেয়ে অর্ধেক মজুরি পেয়ে আসছেন স্থানীয় নারীরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর উপজেলার ৩৬টি কৃষি ব্লকে ২ হাজার ৮৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো ও ৬০০ হেক্টর জমিতে অন্যান্য সবজি চাষ হয়েছে। জমিগুলোয় দেখা যায় নারী শ্রমিকের উপস্থিতিই বেশি। কারণ, নারীদের মজুরি কম। তাই চাষিরা জমির কাজে নারীদেরই নিয়োগ দিচ্ছেন খরচ কমাতে।
ধানকাটার কাজ করছিলেন শিবানী মণ্ডল। কিছু ক্ষোভের সঙ্গেই বললেন, ‘স্বামীর আয়ে সংসার চলে না গো। বাধ্য হয়ে কাজ করি। সারাদিন খেইটে বিটামানুষের অর্ধেক পাই। এইটেই বড় কষ্ট।’
একই সুর নারী শ্রমিক আলেয়া বেগমের কণ্ঠেও। তার ভাষ্য, একই সময়, একই কাজ করি। কিন্তু টাকা নিতে গেলে মনে হয় আমরা মানুষ না, আলাদা কিছু।
আবার নারীর কাজ তো শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ নয়। কাজ শেষে ঘরে ফিরে শুরু হয় তার আরেক যুদ্ধ। রান্না, সন্তান দেখাশোনা, টিউবওয়েল থেকে পানি আনা, হাঁস-মুরগিকে খাবার দেওয়া, তাদের খুঁজে এনে খাঁচায় ঢোকানো—সবকিছুই এক হাতে সামাল দিতে হয় তাদের।
শ্যামলী মণ্ডল বলেছেন, ‘সকাল থেকে মাঠে কাজ করি। বাড়ি এসে আবার রান্না, বাচ্চা সামলাই। দুই কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনতে হয়। এত কষ্টের পরও কেউ আমাদের কাজের দাম দেয় না।’
স্থানীয় চাষি রফিকুল ইসলামও স্বীকার করলেন বৈষম্যের কথা। তিনি জানালেন, নারীরা পুরুষের সমানই কাজ করেন। কিন্তু পুরুষদের দেওয়া হয় ৫৫০ টাকা, নারীদের ৩০০। দীর্ঘদিন ধরেই এ প্রথা চলে আসছে জানিয়ে তিনি বললেন, ‘এটি নিয়ম বলেই ভেবে এসেছি। এতে যে বৈষম্য হচ্ছে, তা কখনো ভেবে দেখিনি।’
উপকূলীয় এ অঞ্চলে পুরুষ শ্রমিকদের একটি বড় অংশ কাজের সন্ধানে শহরে চলে যাওয়ায় কৃষি ও মৎস্য খাতে নারীদের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। কিন্তু সেই নির্ভরতার বিপরীতে বাড়েনি তাদের মজুরি।
তবে মজুরিবৈষম্য কমাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সরকারের কাজ যেন শুধু নারী দিবসে সভা ও মানববন্ধনের মাধ্যমে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো। এমনকি এ উপজেলায় কত নারী শ্রমিক কাজ করেন, তার কোনো পরিসংখ্যানও নেই মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের কাছে।
মজুরি বৈষম্যের বিষয়টি দুঃখজনক হলেও সচেতনতামূলক সভা আর মানববন্ধন করা ছাড়া এ নিয়ে তাদের কিছুই করার নেই, সরল স্বীকারোক্তি দিলেন উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা শারিদ বিন শফিক।
তবে বিষয়টি নিয়ে সরকারিভাবে মাঠপর্যায়ে কাজ করার ওপর জোর দিলেন স্থানীয় নারীনেত্রী নূরজাহান পারভীন ঝর্ণা। তার মতে, সরকারিভাবে নজরদারি বাড়ানো না হলে এই দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়।
এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে নারীরা একসময় কাজের আগ্রহ হারাবে বলে মনে করেন দাতিনাখালি বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠনের পরিচালক শেফালী বেগম। যদিও সুন্দরবনে নিষেধাজ্ঞা থাকায় পুরুষরা কাজ পাচ্ছেন না, তাই নারীদেরই সংসার চালাতে হচ্ছে–বলছিলেন তিনি। কিন্তু কম মজুরি পাওয়ায় সেই সংসার চালানোও কঠিন হয়ে পড়ছে তাদের জন্য।
ক্যাপশন:
১. শ্যামনগরের জেলেখালী বিল থেকে ধান কেটে মাথায় নিয়ে চাষির বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছেন নারী শ্রমিক শ্যামলী মণ্ডল
২. বুড়িগোয়ালিনীর ভামিয়া এলাকায় খোপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধে কাজ করছেন নারী শ্রমিকরা
৩. শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জের ধানখালি এলাকায় বোরো ধান কাটতে ব্যস্ত নারী শ্রমিক
৪. শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জের ধানখালি এলাকায় মৌসুমের শুরুতে বোরো ধানের চারা লাগানোর কাজে নারী শ্রমিকরা



