আগুনে-রোদে পুড়ে ধান শুকান
মজুরি কাঠামো নেই চাতালকন্যাদের

চাতালে কাজ করছেন নারীরা। ছবি: আগামীর সময়
রাইস মিলে ধান সিদ্ধ-শুকানোর কাজ করেন মনোয়ারা বেওয়া। ভোরে ধান সিদ্ধ করার মাধ্যমে শুরু হয় দিনের কাজ। সূর্যের আলো ফুটতেই চাতালে শুকাতে দেন সিদ্ধ ধান। বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত তীব্র রোদে সেগুলো শুকাতে দেন। এরপর ভরতে হয় বস্তায়।
স্বামীর মৃত্যুর পর জীবিকার শেষ ভরসা চালকলের চাতাল। ৬০ বছরের মনোয়ারা এই কাজ করছেন ২০ বছর ধরে। নওগাঁ সদর উপজেলার বরুনকান্দি গ্রামের বাসিন্দা তিনি। সংসারে এক ছেলে, এক মেয়ে। মেয়েকে দিয়েছেন বিয়ে। আর সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে এখন কর্মক্ষমহীন ছেলে।
নওগাঁ বাইপাস সড়কের পাশে তছিরন অটো রাইস মিলে মনোয়ারার মতো একই কাজ করেন ১০ নারী। দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনি। ধান সিদ্ধ করা, চুল্লির আগুন আর চাতালে রোদের তাপে পুড়ে মজুরি মিলে সর্বোচ্চ ১২০ টাকা। সঙ্গে সাড়ে ৫ কেজি খুদ (ভাঙা চাল)। খুদের বর্তমান বাজারদর ৩০ টাকা কেজি। সেই হিসাবে প্রতিদিনের মজুরি দাঁড়ায় ২৭০ থেকে ৩০০ টাকা।
চাতালে কর্মরত নারী শ্রমিকদের বলা হয় ‘চাতালকন্যা’। তাদের শ্রম-ঘামেই তৈরি হয় চাল। কর্মক্ষেত্র নির্ধারিত থাকলেও তাদের নেই কোনো বেতন কাঠামো। হাড়ভাঙা খাটুনি করে মেলে কলমালিকদের বেঁধে দেওয়া মজুরি। তাই শ্রমজীবী নারীদের ভাগ্যও বদলায় না।
মনোয়ারা জানান, ধান শুকানোর ওপর নির্ভর করে তাদের মজুরি। ২০০ মণ ধানে ‘এক চাতাল’। প্রতি চাতাল পরিমাণ ধান সিদ্ধ ও রোদে শুকালে নগদ ৬০০ টাকা এবং ১১০ কেজি খুদ দেন কলমালিক। এক চাতাল ধান রোদে শুকাতে কমপক্ষে দুই দিন এবং আবহাওয়া মেঘাচ্ছন্ন থাকলে তিন থেকে ৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। মজুরি কাঠামো না থাকায় এখনো বঞ্চিত তারা। চাতালে কাজ করে কোনো রকমে চলে জীবন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এই শ্রমিকদের অনেকেই ভূমিহীন ও গৃহহীন। চাতালের একপাশে পলিথিন ও বেড়া দিয়ে খুপরি ঘর বানিয়ে সেখানেই তাদের বাস। দুর্যোগে ক্ষতি বা অসুস্থ হলে তো আর রক্ষা নেই। দেনা করে সামাল দিতে হয় সংকট। মৌলিক অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত।
নওগাঁ জেলা ক্ষেতমজুর অধিকার সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক জয়নাল আবেদীন মুকুলের ভাষ্য, ‘জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩০০ চালকল চালু আছে। এসব কলে ৭৫ থেকে ৮০ ভাগই নারী শ্রমিক। সংখ্যা হিসাবে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার। তাদের অধিকাংশই নিরক্ষর এবং হতদরিদ্র। অধিকার ও মজুরি নিয়েও তারা সচেতন না। তাদের কোনো সংগঠনও নেই। বৈষম্যের শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন তাদের।
‘চাতালকন্যাদের মজুরি কাঠামো নির্ধারণের সময় এসেছে। বৈষম্য দূর করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে বঞ্চিতই থেকে যাবে বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠী। আরও পিছিয়ে পড়বে তারা,’ যোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বললেন, ‘চাতালের কাজটি চুক্তি ভিত্তিক। নারীরা দলগতভাবে কাজটি করেন। নিজের সংসারের কাজের পাশাপাশিই এখানে সময় দেন। এতে একদিকে অদক্ষ নারীদের কর্মসংস্থান হয়, অন্যদিকে নগদ টাকার পাশাপাশি খুদ দেওয়ার ফলে তাদের খাদ্যচাহিদা নিশ্চিত হয়।
‘সরকার চাইলে চালকলগুলো শিল্প হিসেবে ঘোষণা করে শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে পারে। এতে সবাই উপকৃত হবে,’ ইতি টানেন ফরহাদ।



