রামেকে প্রথম হাঁটু প্রতিস্থাপন, খুলল চিকিৎসার নতুন দুয়ার

রামেক হাসপাতালে প্রথমবারের মতো হাঁটু প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার করা হয়, ছবি: আগামীর সময়
দীর্ঘদিন ধরে হাঁটুর অসহ্য ব্যথা। একটু হাঁটলেই কষ্ট। সিঁড়ি ভাঙা তো দূরের কথা, স্বাভাবিকভাবে হাঁটু ভাঁজ করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল ৬০ বছরের বিবিজানের।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই বৃদ্ধার জীবনে সেই কষ্টের অবসানের পথে এবার নতুন আশার আলো জ্বালল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রামেক হাসপাতালে প্রথমবারের মতো হাঁটু প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। অস্টিওআর্থরাইটিসে গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত বিবিজানের একটি হাঁটু সফলভাবে প্রতিস্থাপন করেন হাসপাতালের অর্থোপেডিকস সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকেরা। এর মধ্য দিয়ে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য রামেক হাসপাতালে আধুনিক হাঁটু প্রতিস্থা।
সোমবার সকাল সাড়ে ৯টায় হাসপাতালের অর্থোপেডিকস অপারেশন থিয়েটারে অস্ত্রোপচার শুরু হয়। চলে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত। সফল অস্ত্রোপচারের পর স্বস্তি ফিরেছে চিকিৎসকদের মধ্যেও। তারা বলছেন, রামেকের অর্থোপেডিকস সার্জারি বিভাগের জন্য এটি একটি বিশেষ অর্জন।
বিবিজান দীর্ঘদিন ধরে অস্টিওআর্থরাইটিসে ভুগছিলেন। সময়ের সঙ্গে তার হাঁটুর ক্ষয় তীব্র আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে হাঁটু বেঁকে যায়। তীব্র ব্যথার কারণে স্বাভাবিক চলাফেরা কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি হাঁটু স্বাভাবিকভাবে ভাঁজ করাও সম্ভব হচ্ছিল না।
চিকিৎসকেরা বলছেন, হাঁটুর ক্ষয় যখন গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন শুধু ওষুধ বা সাধারণ চিকিৎসায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। এ অবস্থায় হাঁটু প্রতিস্থাপন আধুনিক চিকিৎসার কার্যকর একটি পদ্ধতি। বিবিজানকে দিয়েই রামেক হাসপাতালে প্রথমবারের মতো সেই অস্ত্রোপচার করা হলো।
অস্ত্রোপচারে অংশ নেন অর্থোপেডিকস সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আলমগীর হোসেন, সহযোগী অধ্যাপক ডা. মনোয়ার তারিক সাবু, সহযোগী অধ্যাপক ডা. সফিকুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাইদ আহমেদ, সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাতিউল ইসলাম ও ডা. সালেহীনসহ বিভাগের আরও কয়েকজন চিকিৎসক।
অস্ত্রোপচার সম্পর্কে সহযোগী অধ্যাপক ডা. মনোয়ার তারিক সাবু বলেছেন, হাঁটুর ওপরের দিকে দুটি হাড় থাকে। অস্ত্রোপচারের সময় টিবিয়ার ওপরের অংশ ৯ মিলিমিটার কেটে নেওয়া হয়। ফিমারের নিচের অংশও ৯ মিলিমিটার কাটা হয়। এরপর সেখানে মেটালের তৈরি কৃত্রিম হাঁটু বসানো হয়।
তিনি আরো বললেন, বিবিজানের এক পায়ে যে কৃত্রিম হাঁটু লাগানো হয়েছে, সেটি উন্নতমানের। এর দাম প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
অধ্যাপক ডা. আলমগীর হোসেন বললেন, অস্ত্রোপচারের পর রোগীর হাঁটু আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তিনি চলাফেরাসহ দৈনন্দিন কাজ করতে পারবেন। তবে এ জন্য কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হবে।
রামেকে প্রথমবার এই অস্ত্রোপচার সফল হওয়াকে উত্তরাঞ্চলের রোগীদের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন চিকিৎসকেরা। অধ্যাপক আলমগীর হোসেন বললেন, এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একজন রোগীর হাঁটু প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার করার পরিকল্পনা তাঁদের রয়েছে।
তিনি আরো বললেন, এ চিকিৎসা নিয়মিত চালু হলে উত্তরবঙ্গের মানুষ উপকৃত হবেন। হাঁটু প্রতিস্থাপনের জন্য তাদের আর ঢাকায় যেতে হবে না। দেশের বাইরেও যাওয়ার প্রয়োজন হবে না।
বিবিজানের একটি ক্ষতিগ্রস্ত হাঁটু বদলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে রামেক হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায় যুক্ত হলো নতুন অধ্যায়। দীর্ঘদিনের ব্যথা ও অচলতার মধ্যে থাকা উত্তরাঞ্চলের বহু রোগীর জন্য এই সাফল্য এখন স্বাভাবিক জীবনে ফেরার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।




