আজও বাবার অপেক্ষায় পাঁচ বছরের হানিফা

২৪ এর অভ্যুত্থান চলাকালে ১৯ জুলাই রংপুরে নিহত কলা ব্যবসায়ী মিরাজুল ইসলামের স্ত্রী ও দুই সন্তান। ছবি: আগামীর সময়
পাঁচ বছর বয়সী মো. হানিফা এখনো বিশ্বাস করে, একদিন ফিরে আসবেন তার বাবা। আকাশের তারা দেখিয়ে সে মাকে বলে, ‘আম্মু, ওই যে আকাশের তারাটা, ওটাই আমার আব্বু। আব্বু নেমে এসো, আমার কপালে একটা চুমু দিয়ে যাও।’
বাড়ির বাইরে সামান্য শব্দ পেলেই দৌড়ে গিয়ে দরজা খোলে। মনে করে, বাবা বুঝি ফিরে এসেছেন। কিন্তু দুই বছর পরও তাকে বোঝানো যায়নি, একটি গুলি চিরতরে কেড়ে নিয়েছে তার বাবাকে।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রংপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন কলা বিক্রেতা মিরাজুল ইসলাম। তার স্ত্রী নাজমীম ইসলাম বলেছেন, ‘স্বামীকে হারানোর শোকের চেয়েও ছোট ছেলেকে বাবার মৃত্যুর সত্যটি বোঝাতে না পারার কষ্ট এখন বেশি।’
রংপুর নগরীর নিউ জুম্মাপাড়া এলাকার বাসিন্দা মিরাজুল ইসলামের সংসারে ছিলেন স্ত্রী, দুই ছেলে ও বৃদ্ধা মা। বড় ছেলে মেহেরাব হোসেন নাজিল (১৭) আমাশু প্রগতি স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছোট ছেলে হানিফার বয়স এখন পাঁচ বছর। পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য রংপুর সিটি বাজারে কলা বিক্রি করতেন মিরাজুল।
নাজমীম ইসলাম স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, ‘প্রথম সন্তানের ১২ বছর পর জন্ম নেওয়া ছোট ছেলে হানিফা ছিল সবার আদরের। বাবার সঙ্গে খাওয়া, রাতে কাঁধে মাথা রেখে ঘুমানো, চকলেট আনার বায়না ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস। মিরাজুলও সাধ্যমতো ছেলের সব আবদার পূরণ করতেন।’
ঘটনার দিনটি ছিল তাদের ১৮তম বিবাহবার্ষিকী। নাজমীম ইসলাম জানিয়েছেন, সকালে বাজার থেকে ফিরে মিরাজুল গোসল করে দুপুরের খাবার খান। পরে বাজার থেকে একটি মুরগি ও পোলাওয়ের চাল এনে বলেন, রাতে সবাই মিলে বিবাহবার্ষিকী উদ্যাপন করবেন। নিজ হাতে মুরগি জবাই করে তিনি কলার আড়তে যান। কাজ শেষ করে দ্রুত বাড়ি ফেরার কথা থাকলেও ফেরা হয়নি আর।
১৯ জুলাই বিকালে জররেজ মার্কেটের সামনে কলার আড়ত থেকে বের হওয়ার সময় একটি গুলি তার বাম পাঁজরে লাগে। স্থানীয়রা দ্রুত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলেও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। রাতে পরিবারের জন্য প্রস্তুত ছিল বিবাহবার্ষিকীর খাবার। কিন্তু বাড়িতে ফিরেছিল মিরাজুলের মরদেহ।
নাজমীম ইসলামের ভাষ্য, ‘জীবিকার তাগিদে বাজারে যাওয়া একজন নিরীহ মানুষ কেন গুলির শিকার হলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর আজও পাননি।’ তিনি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেছেন। একই সঙ্গে জানিয়েছেন, জুলাই শহীদের পরিবারের সদস্য হিসেবে তারা বর্তমানে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন।
মিরাজুলের মা আম্বিয়া খাতুনও ছেলের হত্যার বিচার এবং নাতিদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
একই দিনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন রংপুর নগরীর কামালকাছনা এলাকার সবজি বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেন (৩০)। ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করে সংসার চালাতেন তিনি। স্ত্রী ও পাঁচ বছরের এক কন্যাসন্তান রেখে গেছেন। ১৯ জুলাই বিকালে সিটি বাজারে মালামাল আনতে গিয়ে ফেরার পথে কৈলাশরঞ্জন স্কুল গলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়। তার স্ত্রী কোহিনুর বেগমও দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রংপুর নগরীর সিটি বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষের সময় পুলিশের গুলিতে চারজন নিহত হন। তারা হলেন সাজ্জাদ হোসেন, মিরাজুল ইসলাম, গণেশপুর বকুলতলা এলাকার মোসলেম উদ্দিন মিলন (৪০) এবং পূর্ব শালবন এলাকার আব্দুল্লাহ আল তাহের (৩০)। এর আগের দিন, ১৮ জুলাই, পূর্ব ঘাঘটপাড়া এলাকার অটোরিকশাচালক মানিক মিয়া (৩৫) পুলিশের গুলিতে নিহত হন।
নিহতরা সবাই ছিলেন নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ। কেউ কলা বিক্রেতা, কেউ সবজি বিক্রেতা, কেউ শ্রমিক, কেউ অটোরিকশাচালক। ওই দুই দিনে আহত হন আরও অনেক মানুষ। সেই দিনের স্মৃতি আজও নিহতদের স্বজন ও রংপুরবাসীকে নাড়িয়ে দেয়।
নিহত ও আহতদের ঘটনায় রংপুরে এ পর্যন্ত ৪১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সম্পন্ন হয়েছে। অন্য মামলাগুলোর বিচারপ্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। নিহতদের স্বজনেরা দ্রুত তদন্ত শেষ করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।





