দালাল রোগে ভুগছে হাসপাতাল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
স্নায়ুর সমস্যা নিয়ে বরগুনার বামনা থেকে বাবা জয়ন্ত সাহার চিকিৎসা করাতে বরিশালে আসেন কলেজছাত্র বিপ্লব সাহা। উদ্দেশ্য শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক অমিতাভ সরকারকে দেখাবেন। তার চেম্বারে যেতে নগরীর রূপাতলী এলাকায় নেমে রিকশায় চড়েন বিপ্লব সাহা ও তার বাবা। রিকশাচালক গন্তব্যে যেতে যেতে তাদের কাছ থেকে শোনেন সব কথা। জেলা শিল্পকলা একাডেমির সামনে যেতেই হঠাৎ রিকশা থামিয়ে দেন চালক। তাদের জানালেন, অমিতাভ সরকার অস্ট্রেলিয়ায় গেছেন এক সপ্তাহ আগে। ফিরবেন আরও দুই সপ্তাহ পর। তারা চাইলে তার (অমিতাভ সরকার) চেয়েও ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে পারেন তিনি। তার কথামতো সাউথ ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যান তারা। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর এক আত্মীয়ের ফোনে জানতে পারেন অমিতাভ সরকার দেশেই আছেন, রোগী দেখছেন নিজের চেম্বারে!
বিপ্লব সাহা বলছিলেন, তখনই সম্বিত ফেরে তার। বুঝতে পারেন পড়েছেন দালালের খপ্পরে। বিষয়টি রিকশাচালককে বলতেই ভাড়া না নিয়ে সটকে পড়েন সেখান থেকে।
একইভাবে পিত্তথলির পাথরের সমস্যা নিয়ে নগরীর সদর রোডের বাটার গলি এলাকায় পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি থেকে ডাক্তার দেখাতে আসেন আজগর আলী। গলির মুখেই একদল লোক তাকে সুচিকিৎসার কথা বলে নিয়ে যায় ডি ল্যাব নামের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। ডাক্তারবেশে বসা এক লোক ২০ হাজার টাকার টেস্ট দেন তাকে। পরে সেখান থেকে বের হওয়ার পর জানতে পারেন সব ভুয়া টেস্ট রিপোর্ট ছিল।
আজগর আলীর স্ত্রী জাহানারা বেগম বলছিলেন, ‘গরু বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে বরিশালে এসেছিলাম। দালালের খপ্পরে পড়ে ২০ হাজার টাকাই শেষ আমার।’
এমন ঘটনা বরিশাল নগরীতে অহরহ ঘটছে। সড়কের পাশাপাশি বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল চক্র ওত পেতে বসে থাকে রোগী ধরার জন্য। এরা গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল রোগীদের সরকারি হাসপাতাল থেকে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে একাধিক টেস্টের কথা বলে হাতিয়ে নেয় হাজার হাজার টাকা। বরিশালে হাসপাতালে রোগীর দালালদের উৎপাতের বিষয়ে সম্প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রীও। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, রোগীদের বাইরে নিয়ে জিম্মি করে যারা অপরাধ করছে, সেই দালাল চক্রকে গ্রেপ্তারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালে কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল থাকতে পারবে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বরিশাল নগরীর সরকারি দুই হাসপাতালে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কম করে হলেও ৪০০ দালাল ঘোরে প্রতিদিন। এজন্য অবশ্য রোগীপ্রতি ৫০০-১০০০ টাকা কমিশন নেন তারা।
বান্দ রোড এলাকার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল মো. সাইফুল বলেছেন, ‘রোগীদের ভুলভাল বুঝিয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টার পর্যন্ত এনে দেওয়া আমাদের কাজ। তারপর টেস্টের যে টাকা হয় সেটার ওপর কমিশন পাই আমরা। হাসপাতালে ঢুকে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আপন আত্মীয়ের মতো হয়ে যেতে হয়। তারপর তাদের নিয়ে ডায়াগনস্টিক বা ক্লিনিকে দিয়ে আসি।’ তিনি জানালেন, তাদের ব্যাকআপে রাজনৈতিক দলের নেতা, পুলিশ ও সাংবাদিকও— ধরা পড়লে তারাই ছাড়ানোর ব্যবস্থা করেন।
বরিশাল ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ডা. নজরুল ইসলামের ভাষ্য, সমিতির পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে চিহ্নিত দালালদের আটক করে পুলিশে দেওয়া হয়; কিন্তু নানা প্রভাবে ছাড়া পেয়ে যায় তারা। পরে আবার একই কাজে লিপ্ত হয়।
বরিশাল সিভিল সার্জন মনজুর এ এলাহী অবশ্য দিলেন শিগগিরই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস।




