টানা বৃষ্টিতে ডুবল হাওরের বোরো ধান

টানা বৃষ্টিতে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের দুই হেক্টর জমির বোরো ধান ডুবে গেছে। ছবি: আগামীর সময়
টানা বৃষ্টি, দমকা হাওয়া ও বজ্রপাতে বিপর্যয়ে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা। গত রবিবার বিকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে বৈরী আবহাওয়ায়। একই সময়ে বাজারে ধানের অস্বাভাবিক কম দাম কৃষকদের সংকটকে করেছে আরও গভীর।
কয়েক দিন আগেও যেখানে সোনালি ধান দুলছিল, এখন সেখানে থইথই পানি। কৃষকরা ধান কাটতে নামছেন কোমরপানিতে। কেউ নৌকায়, কেউবা ডুব দিয়ে তুলছেন পচা ধান। আবার বজ্রপাতের আতঙ্কে অনেকেই যাচ্ছেন না মাঠে। অনেক ক্ষেতের ধান এর মধ্যেই হয়ে গেছে নষ্ট।
ঋণ নিয়ে ১০ একর জমিতে বোরো চাষ করেছিলেন অষ্টগ্রামের আব্দুল্লাহপুর হাওরের কৃষক রতন মিয়া। হঠাৎ বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে তার সব ধান। ‘আর চার-পাঁচ দিন পর কাটতে পারতাম। একটা ধানও ঘরে তুলতে পারলাম না। এখন পরিবার চালাব কীভাবে, ঋণ শোধ করব কীভাবে— বুঝতে পারছি না।’
উজানের পানি নামলেই হাওরে ঢুকে পড়ে। নদী ভরাট ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে সেই পানি জমে প্রতিবছরই দেখা দেয় জলাবদ্ধতা— জানালেন একই এলাকার কৃষক হযরত আলী। আরেক কৃষক নজরুল ইসলামের ৯ একরের মধ্যে ৭ একরের ধানই পানির নিচে।
কৃষকদের অভিযোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। নিকলী ও করিমগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬৫০-৭০০ টাকায়, যেখানে উৎপাদন খরচই প্রায় ১ হাজার টাকা। অন্যদিকে শ্রমিকের মজুরি বেড়ে এখন দৈনিক ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা হয়েছে। দুই মণ ধান বিক্রি করেও একজন শ্রমিকের মজুরি মেটানো যাচ্ছে না।
‘এভাবে কৃষি ফসল করে লাভ নেই। দুই মণ ধান বিক্রি করে একজন শ্রমিকের মজুরি দিতে হচ্ছে’— হতাশ নিকলীর কৃষক আব্বাস আলী। সংসারে সচ্ছলতা আনতে তাই ছেলেদের বিদেশে পাঠানোর কথা ভাবছেন তিনি।
ঋণ নিয়ে ধান চাষ করেছেন হালিমা খাতুন। তার ক্ষোভ, ‘ফলন হলেও দাম নেই। এখন ঋণ শোধ করাই কঠিন হয়ে যাবে। এভাবে কৃষিকাজ করে লাভ নেই’। একই সুরে হাসিনা আক্তার বললেন, ‘লোকসানের চাপ সামাল দিতে গরু বিক্রি করে ঋণ শোধ করতে হচ্ছে, তবুও এই পেশা ছাড়ার উপায় নেই।’
কৃষকদের আরেক অভিযোগ, সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ শুরু না হওয়ায় বাজারে বেড়েছে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। কম দামে ধান কিনে ভৈরব বাজার ও করিমগঞ্জের চামটা নৌবন্দরে বেশি দামে বিক্রি করছেন আড়তদাররা।
‘টানা বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে কৃষকরা মাঠে নামতে পারছে না। ধান পাঁচ-ছয় দিন পানির নিচে থাকলে ক্ষতি বাড়বে’— বললেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান। ৮০ শতাংশ পাকা ধান দ্রুত কেটে ফেলার পরামর্শ তার।
অষ্টগ্রামের হাওরে পলি জমে পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা— জানালেন তিনি। বললেন, ‘ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাব পেতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে।’
কৃষি বিভাগের তথ্য, জেলায় বোরোর চাষ হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলের ১ লাখ ৪ হাজার ৪৩৫ হেক্টর (৬২ শতাংশ)। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১১ লাখ ৯৫ হাজার টন ধান এবং ৭ লাখ ৯৬ হাজার টন চাল। এর মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশ ধান কাটা শেষ।
প্রতি কেজি ধানের সরকারনির্ধারিত দাম ৩৬ টাকা (মণপ্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকা)। সরকারিভাবে ধান কেনা শুরু হলে বাজারে দাম কিছুটা বাড়বে এবং কৃষকরা স্বস্তি পাবে বলে প্রত্যাশা কৃষি কর্মকর্তাদের।



