জামালপুর
বংশ খাল এখন আবর্জনার ভাগাড়
- দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ বাসিন্দারা
- খাল হয়েছে মশা-মাছির প্রজনন কেন্দ্র
- ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও বিভিন্ন রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা

ছবি: আগামীর সময়
জামালপুর শহরের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে বংশ খাল। এ খাল ঘিরে গড়ে ওঠে জামালপুর শহর। শহরের পানি নিষ্কাশনের প্রাণ ছিল খালটি। অথচ বর্তমানে সেই খাল পরিণত হয়েছে বিষাক্ত ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে। কালো পচা পানি, অসহনীয় দুর্গন্ধ এবং মশা-মাছির উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন নগরবাসী। খালপাড়ের মানুষের চলতে হয় নাক চেপে।
খালে জমে রয়েছে প্লাস্টিক, পলিথিন, হাসপাতাল ও গৃহস্থালীর বর্জ্যসহ নানা ধরনের আবর্জনা। দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। স্থির পানি ধারণ করেছে কালো রঙ। তার ওপর ময়লার স্তূপ। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে তীব্র দুর্গন্ধ।
শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য একসময় বংশ খালটি ভূমিকা রেখেছে। আর এখন খালে ময়লা-আবর্জনার স্তূপের কারণে মশার প্রজননকেন্দ্রে রূপ নিয়েছে। পৌরবাসী বংশ খালের ময়লার স্তূপ অপসারণ করে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার জন্য দীর্ঘদিন দাবি জানিয়ে এলেও কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিচ্ছে না। ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে শহরের পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতে শহরে দেখা দিচ্ছে জলাবদ্ধতা।
খালটির জামালপুরের অংশটুকু শহরের মালগুদাম, মৃধাপাড়া, দয়াময়ী মোড়, রানীগঞ্জ বাজার, তমাল তলা হয়ে কালীঘাট দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে মিশেছে।
বংশ খালপাড় বাসিন্দাদের ভাষ্য, শহরের মধ্যে খালটির চারপাশে মানুষের বসবাস। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে খালটির কারণে মানুষ অতিষ্ঠ। খালের কাছ দিয়ে হেঁটে গেলেও সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়বে। কার কাছে এর প্রতিবাদ করব? প্রতিবাদ করেও কোনো কাজ হয় না।
সরেজমিন দেখা যায়, খালজুড়ে বাসাবাড়ি, হোটেল, রেস্তোরাঁ, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বর্জ্য ভাসছে। ময়লা-আবর্জনার ওপর মশা ও মাছি উড়ছে। ময়লা-আবর্জনা জমে তৈরি হয়েছে মশা-মাছির নিরাপদ প্রজননকেন্দ্র। কোথাও কোথাও খালের মধ্যে লতাপাতা, গাছে ভরে গেছে। খালের কাছে যেতেই নাকে আসে পচা দুর্গন্ধ। ময়লার স্তূপের ওপর উড়ছে মশা ও মাছি।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রায় ২০০ বছর আগে খালটি তৈরি হয়েছে। জামালপুর থেকে পুরোনো ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদ হিসেবে বংশাই নদ টাঙ্গাইল ও গাজীপুর হয়ে তুরাগ নদে গিয়ে মিশে ছিল। এক সময় বংশাই নদ দিয়ে বড় বড় পাল তোলা নৌকা চলাচল করত। এই নদের দৈর্ঘ্য ছিল ২৩৮ কিলোমিটার। জামালপুর শহরের অংশটুকু মরে গেলেও টাঙ্গাইল, গাজীপুর ও ঢাকা জেলায় বংশাই নদের অস্তিত্ব এখনো আছে।
শহরের রানীগঞ্জ বাজার এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান লাভলু বললেন, একসময় খালটি পরিষ্কার ছিল। দখল ও ময়লা আবর্জনা ফেলে বংশ খালকে ড্রেন পরিণত করেছে। এখন সারাদিন দুর্গন্ধ, মশা ও মাছির উপদ্রব। মশা-মাছির কারণে ঘরে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। বংশ খালের তলা ভরাট হওয়ায় এখন পানি বংশ খালে না গিয়ে উল্টো বাসা-বাড়িতে আসে।
জামালপুর পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিমের ভাষ্য, একসময়ের ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা হিসেবে বংশ খালের যাত্রা শুরু হয়। পালতোলা নৌকার বহর যেত এই খাল দিয়ে। বিভিন্ন এলাকা থেকে এই খালে ব্যবসায়ীরা নৌকা নিয়ে আসতেন। ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে বংশ খালের পাড়ের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। কালের বিবর্তনে ও ভোগবাদীদের লালসার শিকার হয়ে বংশ খালের জামালপুরের অংশটুকু মরে যায়।
ভরাট আর দখল হতে হতে খালটি এখন সরু ড্রেন। খালটি পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব পৌরসভার। কিন্তু ১০ বছরেও সেই উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, জানালেন তিনি।
জামালপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. আজিজুল হক বলেছেন, জমে থাকা নোংরা পানিতে মশার লার্ভা জন্ম নেয়, যা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। দূষিত পরিবেশ থেকে কলেরা-ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই সকল জমে থাকা নোংরা দ্রুত পরিষ্কার করা জরুরি বলে জানিয়েছেন তিনি।
পৌর প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মৌসুমী খানম জানিয়েছেন, বংশ খাল পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বংশ খালের ওপর দিয়ে স্লাপ বসানো কাজ চলছে। তবে ঠিকাদারকে খাল পরিষ্কার করে স্লাপ বসানোর কথা বলা হয়েছে।




