কাজে নেই, বেতন শিটে উপস্থিত

সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) মাঠপর্যায়ের কর্মীদের হাজিরা শিটে গত বছরের এপ্রিল মাসে বিভিন্ন কর্মী ১৩৮ দিন অনুপস্থিত ছিলেন। কিন্তু কম্পিউটারে তৈরি করা চূড়ান্ত বিলে অনুপস্থিত দিনগুলোকে দেখানো হয়েছে উপস্থিত।
শুধু এপ্রিলের এই এক মাসই নয়; এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত পরপর তিন মাসে মোট ২০৬ অনুপস্থিত দিনকে উপস্থিত দেখিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে তুলে নেওয়া হয়েছে ৮২ হাজার ৪০০ টাকা। অভিযোগের ভিত্তিতে সিটি করপোরেশনের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এ দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে।
তবে নাগরিক নেতারা বলেছেন, এটি কোনো অনিচ্ছাকৃত ভুল নয়, পরিকল্পিতভাবে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। তিন মাসে টাকার পরিমাণ কম হলেও কমপক্ষে পাঁচ বছরের বেতন শিট তদন্ত করলে বিপুল অঙ্কের টাকা বেরিয়ে আসতে পারে।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, করপোরেশনের কঞ্জারভেন্সি শাখা থেকে মাস্টাররোল, আউটসোর্সিং ও বহিরাগত প্রায় ১ হাজার ২০০ কর্মচারীর বেতন শিট তৈরি করা হয়। তবে তৈরি করা বেতন বিলের বিষয়ে নানা অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গত বছরের ২৩ জুলাই থেকে ওই বছরের এপ্রিল, মে এবং জুন মাসের বেতন শিট পরীক্ষা করে দেখার জন্য তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে করপোরেশন। কমিটি ওই বছরের ৭ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন দেয়।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসের বিভিন্ন অনুপস্থিত কর্মীর ১৩৮ দিনকে কর্মদিবস দেখিয়ে হাজিরা দেওয়া হয়েছে। একইভাবে মে মাসে অনুপস্থিত কর্মীর ২২ দিনকে কর্মদিবস দেখিয়ে হাজিরা এবং জুন মাসে অনুপস্থিত কর্মীর ৪৬ দিনকে কর্মদিবস দেখিয়ে হাজিরা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তিন মাসে মোট ২০৬ অনুপস্থিত দিনকে কর্মদিবস হিসাবে গণ্য করে প্রতিদিন ৪০০ টাকা হারে মোট ৮২ হাজার ৪০০ টাকা অতিরিক্ত তুলে নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ওয়ার্ড অফিস ও শাখা অফিসের মূল হাজিরা শিটে লাল কালি দিয়ে দিনগুলোকে অনুপস্থিত দেখানো হয়েছিল। কিন্তু চূড়ান্ত কম্পিউটারভিত্তিক বেতন বিল প্রস্তুতের দায়িত্বে নিয়োজিত মোস্তাফিজুর রহমান সে তথ্য পরিবর্তন করে অনিয়মটি করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এজন্য অতিরিক্ত উত্তোলিত অর্থ তাকে করপোরেশনের কোষাগারে জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে এ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি করার পরও তদন্তে মোস্তাফিজুর রহমানের কর্মকাণ্ডকে তার উদাসীনতা ও অসাবধানতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে অভিযুক্তকে অন্য শাখায় বদলি করা হলেও একটি চক্র আবার তাকে কঞ্জারভেন্সির অফিস শাখায় ফেরত এনে আগের দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, উদাসীনতার দোহাই দিয়ে টাকা ফেরত নিয়ে অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমানকে দায়মুক্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। তাকে প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তির আওতায় আনা উচিত। নতুবা এসব অন্যায় রেওয়াজে পরিণত হবে এবং আরও বেড়ে যাবে অনিয়ম।
মাত্র তিন মাসের হিসাবেই প্রায় লাখ টাকার গরমিল পাওয়া গেছে। অন্তত পাঁচ বছর বা যৌক্তিক সময় পর্যন্ত বেতন শিট তদন্ত করা হলে আরও বড় ধরনের অনিয়ম বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করেন বাবুল হাওলাদার। তাই পুরো প্রক্রিয়াটিই তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রহিমা সুলতানা বুশরা বলেছেন, বিষয়টি একদমই তার নলেজে নেই। তবে করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেছেন, করপোরেশনের নির্দেশ অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তি কোষাগারে টাকা জমা দিয়েছেন। তা ছাড়া তাকে অন্য শাখায় বদলি করা হয়েছে। ফের তাকে কঞ্জারভেন্সি শাখায় আনা হচ্ছে কি না, তা জানা নেই।




