স্লুইসগেটে ‘স্বার্থের’ তালা, বৃষ্টি পানিতে ডুবল কুতুবদিয়া

ছবি: আগামীর সময়
সমুদ্রবেষ্টিত কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় টানা ভারী বর্ষণ নতুন কিছু নয়। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রবল বৃষ্টিতেও সাধারণত সেখানে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা বা বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় না। কারণ, দ্বীপজুড়ে নির্মিত বড় বড় স্লুইসগেট ও পানি নিষ্কাশনের ব্রিজ দিয়ে বৃষ্টির পানি দ্রুত সাগরে নেমে যায়। কিন্তু এবার সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মাছ শিকারের সুবিধার্থে কিছু অসাধু ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন স্লুইসগেট ও পানি নিষ্কাশনের ব্রিজ পুরোপুরি খুলে না দেওয়ায় দ্বীপজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে নজিরবিহীন জলাবদ্ধতা। এতে উপজেলার ছয় ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে বাড়িঘর, কৃষিজমি, মাছের পুকুর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কুতুবদিয়ার ইতিহাসে শুধুমাত্র বৃষ্টির পানিতে এত বড় আকারের জলাবদ্ধতা আগে কখনো দেখা যায়নি। তাদের অভিযোগ, জনস্বার্থে নির্মিত স্লুইসগেট ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করায় পানি স্বাভাবিকভাবে সাগরে নামতে পারেনি। ফলে কয়েক দিনের টানা বর্ষণেই পুরো দ্বীপ কার্যত পানিবন্দি হয়ে পড়ে।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বিরামহীন বৃষ্টিতে অন্তত ৬ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তলিয়ে গেছে ১ হাজার ৫০ হেক্টর আউশ ধানের আবাদ, ১০ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ৯৫ হেক্টর সবজির ক্ষেত। এতে কৃষকদের কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অসীম কুমার দাশ জানিয়েছেন, বর্তমানে অনেক জমি এখনো পানির নিচে রয়েছে। পানি নেমে গেলে মাঠপর্যায়ে সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।
অন্যদিকে উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য মতে, জলাবদ্ধতায় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ৭৫টি মাছের পুকুর প্লাবিত হয়ে প্রায় ৪২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে কুতুবদিয়ায় বড় আকারের চিংড়ি ঘের বা বাণিজ্যিক মৎস্য প্রকল্প না থাকায় ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) সাহাদুল ইসলাম।
উপজেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, এই দুর্যোগে ২৫০টি বসতঘর, ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রায় ১৯ কিলোমিটার পাকা ও কাঁচা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় এখনো সড়কের ওপর পানি থাকায় স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষার্থী, কৃষক ও সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্মিত স্লুইসগেটগুলো যদি ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে, তবে তা জনস্বার্থের পরিপন্থী। ভবিষ্যতে এমন মানবসৃষ্ট কৃত্রিম জলাবদ্ধতা রোধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্বাস উদ্দিনের মতে, কুতুবদিয়ার মতো সমুদ্রবেষ্টিত একটি দ্বীপে শুধু অতিবৃষ্টির কারণে এমন জলাবদ্ধতা স্বাভাবিক নয়। তাই স্লুইসগেট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, ব্যক্তি স্বার্থে পানি প্রবাহে বাধা এবং তদারকির ঘাটতি খতিয়ে দেখে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় ভবিষ্যতে সামান্য ভারী বর্ষণেও দ্বীপবাসীকে একই ধরনের দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
এ বিষয়ে কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমান বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম জলাবদ্ধতা প্রতিরোধে সব স্লুইসগেট ও পানি নিষ্কাশনের পথ উন্মুক্ত রাখতে স্থানীয়দের কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, পানি নিষ্কাশনে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা সৃষ্টি করলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র নিরূপণ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।





