দিন দিন পাঠকশূন্য ও জৌলুস হারাচ্ছে ত্রিশালের ‘কবি নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র’

ছবি: আগামীর সময়
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বাল্যস্মৃতি বিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশালের কাজির সিমলা গ্রাম। কবির ছোঁয়ায় এক সময়ের সাধারণ এই অজপাড়াগাঁ আজ দেশ জুড়ে সুপরিচিত। কবির সেই স্মৃতিকে চিরকাল ধরে রাখার জন্য এই প্রত্যন্ত গ্রামে নির্মিত হয়েছিল ‘কবি নজরুল স্মৃতি কেন্দ্র’। শুরুর দিকে দর্শনার্থীদের আনাগোনায় মুখরিত ও জমজমাট পরিবেশ থাকলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জৌলুস ম্লান হয়ে গেছে। দিনে দিনে এখানে যেমন কমেছে দর্শনার্থীর সংখ্যা, তেমনি কেন্দ্রের পাঠাগারটি এখন প্রায় পাঠকশূন্য হয়ে পড়েছে।
নজরুলের জীবনী ও বইপত্র ঘেঁটে জানা যায়, ১৯১৪ সালের জুন মাসে কাজী নজরুল ইসলাম পশ্চিমবঙ্গের আসানসোল থেকে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের কাজির সিমলা গ্রামে এসেছিলেন। সে সময় কাজির সিমলা গ্রামের বাসিন্দা কাজী রফিজ উদ্দিন আসানসোলে দারোগার চাকরি করতেন। সেখানেই কিশোর নজরুলের সঙ্গে তার পরিচয় ও স্নেহ তৈরি হয়। নজরুলকে ভালোবেসে কাজী রফিজ উল্লাহই তাকে নিজের গ্রাম কাজির সিমলায় নিয়ে আসেন এবং ভর্তি করিয়ে দেন স্থানীয় দরিরামপুর হাই স্কুলে। তবে কাজির সিমলা থেকে স্কুলটির দূরত্ব ছিল প্রায় চার-পাঁচ মাইল। যাতায়াতের সুবিধার কথা চিন্তা করে পরবর্তীতে স্কুলের কাছাকাছি বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়িতে নজরুলের জায়গিরের ব্যবস্থা করা হয়। সেখান থেকেই নজরুল স্কুলে যাতায়াত করতেন। তখন কবির বয়স ছিল ১৩-১৪ বছর। এই অঞ্চলে প্রায় দেড় বছর সময় কাটানোর পর নজরুল আবার চুরুলিয়ায় চলে যান এবং পরে আর কখনো ময়মনসিংহে ফিরে আসেননি।
ত্রিশালবাসী নজরুলের এই অল্প সময়ের স্মৃতি নিয়েই অত্যন্ত গর্ব করেন এবং কবিকে নিজেদের আপনজন মনে করেন। তাদের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রত্যাশার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ত্রিশালের কাজির সিমলা ও নামাপাড়া— এ দুটি স্থানে দুটি পৃথক স্মৃতি কেন্দ্র নির্মাণ করে। এর মধ্যে নামাপাড়ার স্মৃতি কেন্দ্রটি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে নিয়মিত মানুষের যাতায়াত ও আনাগোনা রয়েছে। কিন্তু কিছুটা অবহেলা আর দূরত্বের কারণে যেন আড়ালে পড়ে গেছে কাজির সিমলার কবি নজরুল স্মৃতি কেন্দ্রটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালের ২৫ আগস্ট তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা বেগম রাশেদা কে চৌধুরী নজরুল ইনস্টিটিউটের অধীন এই স্মৃতি কেন্দ্রটি উদ্বোধন করেন। এখানে রয়েছে ১০০ আসনের একটি চমৎকার মিলনায়তন। পাঠাগারে নজরুলসহ বিভিন্ন লেখকের সাড়ে ৩ হাজারেরও বেশি বই রয়েছে। তবে কবির ব্যবহৃত স্মৃতিচিহ্ন বলতে এখানে সংরক্ষিত আছে কেবল একটি খাট। শুক্রবার ও শনিবার— এ দুদিন বাদে সপ্তাহের বাকি দিনগুলোয় কেন্দ্রটি খোলা থাকে।
স্মৃতিকেন্দ্রটিতে এখন দর্শনার্থীদের আনাগোনা খুবই সীমিত। সবচেয়ে করুণদশা পাঠাগারটির। একসময় এখানে নিয়মিত দৈনিক পত্রিকা রাখা হলেও করোনা মহামারীর পর থেকে তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। পত্রিকা না থাকায় এখন আর কেউ পাঠাগারে এসে বসেন না। এ ছাড়া ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক থেকে কাজির সিমলা যাওয়ার সংযোগ সড়কটি গত কয়েক বছর ধরে খানাখন্দে ভরা। রাস্তার বেশ কিছু স্থানে বড় বড় গর্ত ও ভাঙা থাকায় যেকোনো যানবাহন নিয়ে যাতায়াত করা বেশ কষ্টকর। সড়কটির এমন ভগ্নদশার কারণেও দর্শনার্থীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
স্মৃতিকেন্দ্রের লাইব্রেরিয়ান মো. রাসেল হোসাইন জানালেন, শুরুর দিকে এখানে প্রচুর মানুষ আসতেন। কিন্তু এখন দর্শনার্থীর সংখ্যা অনেক কমে গেছে এবং পাঠাগারটি পাঠকশূন্য হয়ে পড়েছে। করোনার পর থেকে পত্রিকা দেওয়া বন্ধ থাকায় এবং ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে দর্শনার্থীরা প্রায়ই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত সিদ্দিকী জানালেন, তিনি সড়কটি দ্রুত সংস্কার ও নির্মাণের জন্য এলজিইডি কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।
অন্যদিকে নজরুল ইনস্টিটিউটের সহকারী পরিচালক মনির হোসেন জানালেন, পাঠাগারে আবার পত্রিকা চালু করার বিষয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলবেন। তবে দর্শনার্থী কমে যাওয়া এবং পাঠাগারে পাঠক না আসার বিষয়ে তিনি মনে করেন, স্থানীয় সুধীজন, সচেতন মহল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের এ কেন্দ্রটিকে সচল করতে আরও উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে।




