ভাঙা হচ্ছে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুরের ভাস্কর্য, জানে না প্রশাসনের কেউই!

ঝিনাইদহে ভেঙে ফেলা হচ্ছে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ‘অসম্পূর্ণ ভাস্কর্য’— আগামীর সময়
জাতির ৭ সূর্য সন্তানের মধ্যে অন্যতম শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমান। স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব পান তিনি। ঝিনাইদহে গত চার দিন ধরে ভাঙা হচ্ছে সেই বীরশ্রেষ্ঠের নামের চত্বর ও ‘অসম্পূর্ণ ভাস্কর্য’। তবে কার নির্দেশে এবং কী কারণে এটি অপসারণ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি প্রশাসন, পৌরসভা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক কর্মী, সুশীল সমাজ এবং সচেতন নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের পরিবারের অভিযোগ, তাদের কিছু না জানিয়েই চত্বর অপসারণ করা হচ্ছে। তারা এটিকে ইতিহাস থেকে বীরের নাম মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র বলে মনে করছেন।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের সামনে অবস্থিত চত্বরটি ভাঙার কাজ চলছে। কয়েক দিন ধরে শ্রমিকেরা এ কাজ করছেন।
শ্রমিকদের ভাষ্য, ওই স্থানে প্রায়ই ছোটখাটো সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। তাই পৌরসভার উদ্যোগেই এটি অপসারণ করা হচ্ছে বলে তারা শুনেছেন। তবে পৌরসভার প্রশাসক রথিন্দ্র নাথ রায় এ দাবি অস্বীকার করে বললেন, ‘এ কাজটি কে করছে আমরা জানি না। পৌরসভার পক্ষ থেকে এটি করা হচ্ছে না।’
স্থানীয় পথচারী ও শ্রমিকরা জানান, কয়েক দিন ধরে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ও চত্বর অপসারণ করা হচ্ছে। তবে কারা করছে এবং কেন করছে, তা তাদের জানা নেই। তারা বীরের প্রতি সম্মান জানিয়ে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নির্মাণের দাবি জানান।
বাসচালক সাগর হোসেন বলেছেন, ‘এই সড়ক দিয়ে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল করে। ভাস্কর্যটি এমন জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে, সড়কের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে কোনো গাড়ি আসছে কি না দেখা যায় না। এতে অনেক সময়ই আমাদের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়। এর আগে ছোট-বড় দুর্ঘটনাও ঘটেছে।’
তিনি মনে করেন, ভাস্কর্যটি অপসারণ করলে যানবাহন চলাচলে সুবিধা হবে। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরাও চাই ঝিনাইদহের ইতিহাস ও গর্ব এই বীরের ভাস্কর্য নতুন কোনো স্থানে নির্মাণ করা হোক।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল হোসেন মন্তব্য করেন, ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান ঝিনাইদহ তথা সারা দেশের গর্ব। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজের জীবন দিয়ে বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস লিখে গেছেন। দিনের বেলায় তার স্মৃতিচিহ্ন অপসারণ করা হচ্ছে। আমরা দাবি করি, দ্রুত ওই স্থানে বা অন্য কোথাও বীরের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হোক। তা না হলে এটি হবে অত্যন্ত দুঃখজনক এবং বীরকে অসম্মান করা হবে।’
জেলা বিএনপির নেতা আব্দুল মজিদ বিশ্বাস জানলেন, বাস টার্মিনালে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য তৎকালীন জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার উদ্যোগে নির্মাণ শুরু হয়েছিল। তবে কাজটি শেষ করা হয়নি। তার মত, এমন জায়গায় ভাস্কর্যটি করা হয়েছে, যেখানে একটি বাস এলে অন্য পাশের বাস দেখা যায় না।’ যেই অপসারণ করুক না কেন, নতুন করে বীরের ভাস্কর্য নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে ঝিনাইদহ পৌরসভার উদ্যোগে প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালসংলগ্ন সড়কের মোড়ে ৩০ ফুট উচ্চতা ও ১০ ফুট প্রস্থের বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। তবে অজ্ঞাত কারণে ভাস্কর্যটির কাজ সম্পূর্ণ না করেই ফেলে রাখা হয়। এর মধ্যে দুই দফা মেয়র পরিবর্তন এবং দুই দফা প্রশাসক নিয়োগ হলেও প্রকল্পটির কাজ আর শেষ হয়নি। দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকায় চত্বরে আগাছা জন্মেছিল এবং ভাস্কর্যটি অপরিচ্ছন্ন ছিল।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাতিজা হাফিজুর রহমান বলেছেন, ‘খবর পেয়ে আমি সরেজমিনে দেখতে গিয়েছিলাম কেন অপসারণ করা হচ্ছে। আমার চাচা গোটা দেশের সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন। আমাদের না জানিয়ে এটি অপসারণ করা দুঃখজনক। আমরা মনে করি, ইতিহাস থেকে তার নাম মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।’
তিনি অবিলম্বে নতুন করে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণের দাবি জানান।
জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বললেন, ‘এটা যে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য, তা জানা ছিল না। কারণ এটা অসম্পূর্ণ। তা ছাড়া জেলা প্রশাসন এটা ভাঙছে, বিষয়টি এমন নয়। অনেক আগেই এটি ওই স্থান থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সম্ভবত সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং পৌরসভা সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে।’
তিনি আরও জানান, নতুন করে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি প্রতিকৃতি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।





