৭ ইসলামী দলকে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়াতে চায় হেফাজত

কওমি ঘরানার সাত ইসলামী রাজনৈতিক দলের মধ্যে দূরত্ব ঘোচানোর উদ্যোগ নিয়েছে অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। হেফাজতের কার্যক্রমকেও ফের বেগবান করতে আমির ও মহাসচিব সাত দলকে ঐক্যবদ্ধ করার এ প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।
ঐক্য প্রক্রিয়ার এক সভায় উপস্থিত কয়েক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ইসলামী দলগুলোকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে করা নির্বাচনী জোট ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছেন হেফাজতের ‘মুরব্বিরা’। তবে নির্বাচনী জোট অক্ষুণ্ন রেখে হেফাজতের নেতৃত্বে ঐক্য জোরদারের পক্ষে মত দিয়েছেন কেউ কেউ।
হেফাজতে ইসলামের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা সালাউদ্দিন নানুপুরী বললেন, ‘দু-একটি ইসলামী দল নির্বাচনী জোট করেছিল। সব দল করেনি। যারা জোট করেছিল তারা সেখানে থাকবে, নাকি হেফাজতের নেতৃত্বে আগের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ থাকবে, সেটা জানতে চাওয়া হয়েছিল। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কিংবা অন্য দলের সঙ্গে যারা জোট করেছে তাদের আলাদা হয়ে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’
আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় জামেয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে মতবিনিময় সভা হয়েছে। এতে সভাপতিত্ব করেন হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। মহাসচিব সাজিদুর রহমানসহ মোট ১০ জন ‘হেফাজতের মুরব্বি’ অর্থাৎ কওমি ঘরানার শীর্ষ আলেমের উপস্থিতিতে সভায় আলোচনা হয়েছে।
সভায় সাতটি ইসলামী রাজনৈতিক দলের প্রতিটির তিনজন করে প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। দলগুলো হলো- জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত আন্দোলন, খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলন (চরমোনাই পীর)।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের’ হয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন অংশ নেয়। আর বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেয় ইসলামী ঐক্যজোট ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম।
বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রণীত নারী নীতির বিরোধিতা করে ২০১০ সালে আত্মপ্রকাশ করে কওমি মাদ্রাসা ঘরানার অরাজনৈতিক সংগঠন ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।’ ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে অবরোধ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তারা প্রথম প্রকাশ্যে বড় কর্মসূচি পালন করে। এর পর থেকে নানা ঘটনাপ্রবাহে গত একযুগেরও বেশি সময় ধরে অরাজনৈতিক হেফাজতই রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল।
প্রতিষ্ঠাতা আমির আহমদ শফী ও মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীর মৃত্যুর পর সংগঠনটির কার্যক্রম কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আবার সরব হয়। পরে সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক ডামাডোলে আবারও পিছিয়ে পড়ে।
শুরু থেকেই হেফাজতে ইসলামের মূল শক্তি কওমি ঘরানার ইসলামী দলগুলো। নির্বাচনী জোটে যাওয়া নিয়ে দলগুলোর মধ্যে বিভক্তির রেশ হেফাজতেও পড়েছিল বলে জানালেন সংগঠনটির কয়েকজন নেতা।
সভায় উপস্থিত থাকা হেফাজতে ইসলাম ও খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মীর ইদ্রিস বললেন, ‘সাত দল আগে এক ছিল। পরে কেউ বিএনপির সঙ্গে আবার কেউ জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়া নিয়ে মনোমালিন্য হয়। এখন হেফাজতের মুরব্বিরা একটা উদ্যোগ নিয়েছেন যেন তারা আবার ঐক্যবদ্ধ হয়। তাদের জোট ছেড়ে আসার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে একটি রূপরেখা তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
‘খেলাফত আন্দোলন কোনো নির্বাচনী জোটে নেই। মুরব্বিরা যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তার সঙ্গে আমরা একমত। আমরাও চাই ইসলামী দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে হেফাজতে ইসলামকে শক্তিশালী করুক।’- বললেন মীর ইদ্রিস।
জোট ছাড়ার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সভায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক বললেন, ‘সভায় এমন কোনো আলোচনা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। আমরা হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে আছি। আমরা কীভাবে আরও কাছাকাছি আসতে পারি, পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা আরও কীভাবে বাড়ানো যায় সেই বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীরও একধরনের ‘বোঝাপড়া’ তৈরি হয়েছিল। যদিও হেফাজতের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বরাবরই জামায়াতের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান জানান দিয়ে এসেছেন। এরপরও কয়েকটি ইসলামী দলের জামায়াতের সঙ্গে মিলে নির্বাচনে যাওয়া নিয়ে হেফাজতের মধ্যে একধরনের ‘অস্বস্ত্বি’ ছিল বলে কয়েক নেতা জানালেন।
এ অবস্থায় নির্বাচনের পাঁচ মাস পর জামায়াতকে বাদ দিয়ে সমমনা সাত ইসলামী দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করলেন হেফাজতের শীর্ষ নেতারা। এর মধ্য দিয়ে ইসলামী দলগুলোকে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে সভায় অংশ নেওয়া কয়েকজন জানালেন।
‘মুরব্বিদের’ সিদ্ধান্তে জামায়াতে ইসলামীকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানালেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী। বললেন, ‘জামায়াতকে রাখা, না রাখার সিদ্ধান্ত তো মুরব্বিদের। এর আগেও দুইটি বৈঠক হয়েছে। এটা তৃতীয় বৈঠক। আগের বৈঠকগুলোতেও জামায়াত ছিল না। বৈঠকের লক্ষ্য হচ্ছে ইসলামী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ রাখা।’
মাওলানা সালাউদ্দিন নানুপুরী বললেন, ‘জামায়াত কখনোই হেফাজতের সঙ্গে ছিল না। এখনো নেই। ইসলামী সাত দলকে বলা হয়েছে তোমরা হেফাজতের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হও।’






