পর্যটননগরী কুয়াকাটায় বাড়ছে অগ্নিঝুঁকি, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের দাবি

সংগৃহীত ছবি
দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা এবং বৃহৎ মৎস্যবন্দর মহিপুরে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কুয়াকাটায় নিজস্ব ফায়ার সার্ভিস স্টেশন না থাকায় আগুন লাগার পর দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয় না। ফলে প্রতিবারই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়েই চলেছে।
সর্বশেষ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ভোর সাড়ে ৬টার দিকে কুয়াকাটার তালতলা মার্কেট এলাকায় সিকুইন হোটেলের পাশে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুটি হোটেলসহ আটটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ পুড়ে যায় এবং আরও তিনটি দোকান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন ব্যবসায়ীরা।
এর আগে ১১ মার্চ কুয়াকাটার ঝাউবন এলাকায় দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে একটি জেলে নৌকা পুড়ে যায়। একই বছরের ১০ এপ্রিল মধ্যরাতে বেরিবাঁধের পশ্চিম পাশে একটি আচারের দোকানে আগুন লেগে লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়। ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর লতাচাপলী ইউনিয়নের মম্বিপাড়া নতুন বাজারে অগ্নিকাণ্ডে পাঁচটি দোকান পুড়ে যায়। এর মধ্যে তিনটি সম্পূর্ণ এবং দুটি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানা যায়।
অন্যদিকে, মহিপুর মৎস্যবন্দরে ২০২৪ সালের ৫ এপ্রিল রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২৩টি মাছের আড়ৎ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ব্যবসায়ীদের দাবি, এতে প্রায় ৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। একই বছরের ৩ মার্চ মধ্যরাতে আরেকটি অগ্নিকাণ্ডে ছয়টি দোকান পুড়ে যায়, যেখানে অন্তত ৪০ লাখ টাকার ক্ষতির কথা জানান ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক পর্যটকের আগমন ঘটে। গোসল করতে নেমে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও থাকে। সেখানে সার্বক্ষণিক ফায়ার সার্ভিস টিম থাকলে দুর্ঘটনার সময় দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হতো।
দীর্ঘদিন ধরেই কুয়াকাটায় একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা। চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি ‘কুয়াকাটা স্টুডেন্ট অ্যালায়েন্স’-এর ব্যানারে প্রায় শতাধিক মানুষের অংশগ্রহণে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে বক্তারা জানান, কুয়াকাটা থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কলাপাড়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় আগুন দ্রুত ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
তাঁরা আরও জানান, কুয়াকাটা একটি ব্যস্ত পর্যটন এলাকা হওয়ায় এখানে শতাধিক হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও বিপুলসংখ্যক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা অগ্নিঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং জানমাল রক্ষায় দ্রুত একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কুয়াকাটা পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জসীমউদ্দীন জানান, ২২ কিলোমিটার দূর থেকে ফায়ার সার্ভিস আসতে আসতে আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করে। আমরা নিজেরাই আগুন নেভানোর চেষ্টা করি, কিন্তু সব সময় তা সম্ভব হয় না।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম. মোতালেব শরীফ বলেছেন, ‘এখানে শত শত হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে। আগুন লাগলে আমরা অসহায় হয়ে পড়ি। ফায়ার সার্ভিস আসতে আসতে সব শেষ হয়ে যায়। দ্রুত একটি স্টেশন স্থাপন অত্যন্ত জরুরি।’
মহিপুর মৎস্যবন্দর আড়ৎ ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাজু আহমেদ রাজা বলেছেন, ‘মৎস্যবন্দরে আগুন লাগলে কয়েক মিনিটেই ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যায়। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে। তাই স্থায়ী ব্যবস্থা প্রয়োজন।’
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কুয়াকাটায় প্রায় দুই শতাধিক আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট, ৫০টির বেশি খাবার হোটেল এবং পাঁচ শতাধিক ছোট-বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। পাশাপাশি মহিপুর ও আলিপুর মৎস্যবন্দর এবং কেবল ল্যান্ডিং স্টেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও এখানে অবস্থিত। এত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও ফায়ার সার্ভিস স্টেশন না থাকায় পুরো এলাকা বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স পটুয়াখালীর সহকারী পরিচালক মো. আবুল বাশার জানান, “কুয়াকাটা আমাদের কভারেজ এলাকায় থাকলেও দূরত্ব বেশি হওয়ায় ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সময় লাগে। দ্রুত সাড়া দিতে হলে সেখানে একটি আলাদা স্টেশন জরুরি। আমরা ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছি। যেহেতু এটি একটি সময়সাপেক্ষ বিষয়, তারপরও অতি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বিবেচনায় কুয়াকাটায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নির্মিত হবে বলে আশা করছি।”
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কাউসার হামিদ বলেছেন, ‘কুয়াকাটায় এর আগে একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে নিকটতম ফায়ার সার্ভিস স্টেশনটি কলাপাড়ায় অবস্থিত, যা কুয়াকাটা থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে। এ বিষয়ে স্থানীয় জনগণ দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে। আমরা বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে উত্থাপন করেছি।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘কুয়াকাটা দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র। পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এখানে একটি স্থায়ী ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের জন্য আমরা কাজ করছি। বিষয়টি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আমরা আশা করছি।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং সচেতন মহল দ্রুত সময়ের মধ্যে কুয়াকাটায় একটি পূর্ণাঙ্গ ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনায় অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।




