বগুড়া সিটি করপোরেশন
দ্বিগুণ যানবাহন, যানজটে স্থবির
- দৈনিক ধারণক্ষমতা ৫০ হাজার যানবাহন, চলছে ১ লাখের বেশি
- নগরীতে প্রায় ৩০ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ২০ হাজার ইজিবাইক
- সিএনজিচালিত অটোরিকশার জন্য গড়ে উঠেছে ২৫-৩০টি অবৈধ স্ট্যান্ড
- ঠনঠনিয়া বাস টার্মিনাল ও সাতমাথার বাসস্ট্যান্ডে পার্কিংয়ের কারণে সড়ক সংকুচিত

ছবি: আগামীর সময়
বগুড়া শহরের সড়কগুলো একসময় দিনে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার যানবাহনের চাপ সামলানোর উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল। এখন সেখানে প্রতিদিন চলাচল করছে ১ লাখের বেশি যানবাহন। ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ এই চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনুমোদনহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক, সিএনজিচালিত অটোরিকশার অবৈধ স্ট্যান্ড ও যত্রতত্র পার্কিং। ফলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোয় যানজট লেগেই থাকছে। এতে নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা, বাড়ছে নগরবাসীর ভোগান্তি। পরিস্থিতি সামলা দিতে হিমশিম খাচ্ছে ট্রাফিক বিভাগ।
বগুড়া সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালে যানজট কমাতে নগরীর প্রধান সড়কগুলো ৬০ ফুট প্রশস্ত করা হয়েছিল। তখনকার যানবাহনের চাপ বিবেচনায় নিয়ে সড়কব্যবস্থা পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু গত দুই দশকে যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও সড়কের ধারণক্ষমতা সে অনুযায়ী বাড়েনি।
সিটি করপোরেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নগরীতে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার রিকশা চলাচল করলে যানজট নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অথচ বর্তমানে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। ইজিবাইক রয়েছে অন্তত ২০ হাজার। এসব রিকশার কোনো অনুমোদন নেই বলে দাবি সিটি করপোরেশনের।
নগরীর প্রাণকেন্দ্র সাতমাথার আশপাশে চলাচল করে হাজার হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা। এসব যানবাহনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মোড় ও সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে ২৫-৩০টি স্ট্যান্ড। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, এসব স্ট্যান্ডের বেশিরভাগই অবৈধ। সড়কের পাশে যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকায় চলাচলের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। সাতমাথা, থানা মোড়, বড়গোলা, দত্তবাড়ী ও শেরপুর রোডে তাই যানজট নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে উঠেছে।
জেলা বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, বগুড়ায় নিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ৭ হাজার ৭৫৮। তবে নিবন্ধন নবায়নের তথ্য হালনাগাদ না থাকায় এসব যানবাহনও অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে দাবি দপ্তরটির। বিআরটিএর সহকারী পরিচালক হারুন অর রশিদ বলেছেন, জেলায় সর্বোচ্চ ১০ হাজার সিএনজি চলাচলের ধারণক্ষমতা রয়েছে। অথচ চলাচল করছে অন্তত ২০ হাজার।
যানজটের আরেকটি কারণ বাসের পার্কিং। প্রায় তিন দশক আগে চালু হওয়া ঠনঠনিয়া বাস টার্মিনালে একসঙ্গে ১০টি বাস রাখার জায়গা থাকলেও সেখানে গড়ে ৩০টি বাস অবস্থান করে। ফলে সড়কের প্রায় অর্ধেক অংশ বাসের পার্কিং ও যাত্রী ওঠানামায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
করতোয়া গেটলক সার্ভিসের প্রায় ৪৫টি বাস বগুড়া-শেরপুর পথে চলাচল করে। শেরপুর ও ধুনট উপজেলা এবং সিরাজগঞ্জের কাজীপুর ও তাড়াশের প্রায় ১০ হাজার মানুষ এসব বাসে যাতায়াত করেন। বাসগুলোর স্ট্যান্ড সাতমাথা থেকে সরাতে চলতি বছরের ২৩ জুন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে সিটি করপোরেশন। তবে এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। এ ছাড়া ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬০টি বড় স্কুলবাস নগরীর অন্তত ৫০টি স্থানে থামে। এতে ব্যস্ত সড়কে যানবাহনের চাপ আরও বেড়ে যায়।
জলেশ্বরীতলা এলাকার বাসিন্দা ও ব্যাংক কর্মকর্তা জোবায়ের আহমেদ জানিয়েছেন, তার বাসা থেকে বড়গোলায় অফিসের দূরত্ব ২ কিলোমিটারের কম। সাতমাথা হয়ে যেতে যানজটের কারণে ৫ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে ২০ মিনিট বা তার বেশি সময় লাগে। প্রায়ই অফিসে পৌঁছাতে দেরি হয়।
সেউজগাড়ীর বাসিন্দা লোকমান হোসেনের ভাষ্য, অল্প দূরত্বের পথেও যানজটে আটকে থাকতে হয়। সড়কে অটোরিকশার আধিক্যের পাশাপাশি পার্কিংয়ের সংকটও সমস্যা বাড়াচ্ছে। বাণিজ্যিক ভবনগুলোয় পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় গাড়ি ও মোটরসাইকেল সড়কের ওপর রাখা হচ্ছে।
এদিকে সম্প্রতি অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে শহরের বিভিন্ন স্থানে বাঁশ দিয়ে আলাদা লেন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ। তবে তাতে যানজট পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) আতোয়ার রহমানের দাবি, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কারণে সড়কে মানুষের চলাচল ও যানবাহনের চাপ বাড়ছে। অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও যানবাহনের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। সবপক্ষের সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া যানজট নিয়ন্ত্রণ কঠিন।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ সাইদ আলী বলেছেন, যানজট কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ব্যাটারিচালিত রিকশা নিবন্ধনের আওতায় আনতে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ঠনঠনিয়া বাস টার্মিনাল বনানীতে স্থানান্তর এবং করতোয়া গেটলক সার্ভিসের বাসগুলোকে শহরের বাইরে দিয়ে চলাচলের ব্যবস্থা করার প্রক্রিয়াও চলছে।




