‘আইসিইউতে’ মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
বরিশাল জেলার সবচেয়ে দুর্গম ও নদীবেষ্টিত উপজেলা মেহেন্দিগঞ্জ। ১৬টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ উপজেলার জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। যাদের বড় একটি অংশ কৃষক ও মৎস্যজীবী। এসব মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
অথচ এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিই জর্জরিত নানা সংকটে। শুধু চিকিৎসক-নার্স সংকটই নয়, নেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামও। ৫০ শয্যার হাসপাতালে ভর্তি থাকেন ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ রোগী। সিট না পেয়ে বারান্দায় শুয়েই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেককে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। রোগীর চাপের তুলনায় হাসপাতালের শয্যা ও জনবল কম হওয়ায় সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
হাসপাতালে নেই আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও এক্স-রে মেশিন। সেল কাউন্টার না থাকায় করা যায় না সিবিসিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ফলে এসব পরীক্ষা করতে বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে রোগীদের। এতে বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে তাদের। অর্থের অভাবে অনেক অসচ্ছল রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাটাছেঁড়া বা গুরুতর জখমের রোগী হাসপাতালে নিয়ে গেলে অনেক সময় তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় বরিশাল শহরে। অথচ মেহেন্দিগঞ্জ থেকে বরিশাল সদরে যেতে নৌপথে সময় লাগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। দ্রুতগামী স্পিডবোটে গেলেও সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। সংকটাপন্ন রোগীর ক্ষেত্রে এই সময়টুকুও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় কয়েকজন জানান, আগের সরকারের সময়ে রোগী পরিবহনের জন্য হাসপাতালে একটি নৌ অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অবহেলা ও অযত্নে কিছুদিন পর সেটি অচল হয়ে যায়। এখন রোগী পরিবহনে ভাড়ায় চালিত স্পিডবোটই প্রধান ভরসা। বরিশাল যেতে রিজার্ভ স্পিডবোটে খরচ হয় ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। সামর্থ্য না থাকায় অনেকে লঞ্চে যাতায়াত করেন। এতে পথে রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।
হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ দুটি অ্যাম্বুলেন্সের একটি অচল। অন্যটিও জরাজীর্ণ। একটি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে পুরো উপজেলার রোগী পরিবহন করতে গিয়ে অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘ সময়। বিকল্প হিসেবে রোগী নিয়ে যেতে হচ্ছে থ্রি-হুইলার বা অটোরিকশায়। সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে আরও বাড়ছে দুর্ভোগ।
হাসপাতালের টয়লেটগুলোর অবস্থাও শোচনীয়। অপরিচ্ছন্নতার কারণে অনেক টয়লেটে ঢোকাও কঠিন। কোনো কোনো টয়লেটের দরজার লক নষ্ট। আবার কিছু দরজা ভাঙা।
উলানিয়ার রাজাপুর এলাকার বাসিন্দা মুবিন জানান, দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করে সংগ্রহ করতে হয় টিকিট। এরপর চিকিৎসকের কাছে দেখাতেও সিরিয়ালে থাকতে হয় দীর্ঘ সময়। কোনো পরীক্ষা দেওয়া হলে সেটিও বাইরে থেকে বাড়তি টাকা দিয়ে করাতে হয়।
পাতারহাট বন্দরের বাসিন্দা সাকিব বললেন, ‘গ্লাসে মেয়ের হাত কেটে গেলে হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে দ্রুত বরিশাল নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে প্রায় দুই ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে দায়িত্বরত চিকিৎসকের নির্দেশে একজন ওয়ার্ডবয় আমার মেয়ের হাত সেলাই করে দেন।’
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৫০ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও এখন কর্মরত আছেন মাত্র ছয়জন। ৩৬ জন নার্সের বিপরীতে আছেন ২১ জন। পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছেন মাত্র দুজন। নেই কোনো ওয়ার্ডবয়। ল্যাব অ্যাটেনডেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদও শূন্য। ফলে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, নদীবেষ্টিত ও দুর্গম এলাকা হওয়ায় চিকিৎসক ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। নিয়োগ দেওয়া হলেও বিভিন্ন উপায়ে বদলি হয়ে চলে যান অনেক চিকিৎসক। ফলে কাগজে-কলমে পদ থাকলেও বাস্তবে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক পাওয়া যায় না। এতে বাড়তি চাপ পড়ছে কর্মরত চিকিৎসকদের ওপর।
মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. মোহাম্মদ ইমরানুর রহমান জানান, প্রয়োজনের তুলনায় হাসপাতালে জনবল অনেক কম। ৫০টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ছয়জন। এ ছাড়া নার্স, আয়া, ওয়ার্ডবয় ও ল্যাব অ্যাটেনডেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ পদেও জনবল সংকট রয়েছে। এতে সেবা দিতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।
তিনি জানান, শূন্য পদে জনবল নিয়োগের জন্য এরইমধ্যে সচিব ও বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) বরাবর চিঠি পাঠানো হয়েছে। হাসপাতালে আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও এক্স-রে মেশিন নেই। সেল কাউন্টার না থাকায় সিবিসিসহ অনেক পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম পাওয়া গেলে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. রেফায়েতুল হায়দার জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা জানা হবে। এরপর দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।







