‘বাজেট বুঝি না বাবা, ডাল-ভাত পেলেই চলে’

গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের বির্তুল গ্রামের বাসিন্দা মো. ফাইজুল হোসেন। রাস্তার ধারের ছোট্ট ছাপড়ি দোকানটিই এখন তার সংসারের একমাত্র ভরসা। ছবি: আগামীর সময়
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের বির্তুল গ্রামের ব্যস্ত সড়ক দিয়ে একের পর এক যানবাহন ছুটে যাচ্ছে। রাস্তার পাশে ছোট্ট একটি ছাপড়ি ঘর। চারদিকে প্লাস্টিকের বস্তা টাঙানো, মাথার ওপর পাটখড়ির ছাউনি। ভেতরে কয়েকটি কাঠের বেঞ্চ। বাহ্যিক চাকচিক্য বলতে কিছুই নেই। তবু প্রতিদিন বিকেল হলেই জমে ওঠে দোকানটি।
কেউ এক কাপ চায়ের জন্য থামে, কেউ গরম পিঠার খোঁজে আসে। কেউ আবার ছোলা, পিয়াজু কিংবা সেদ্ধ ডিম খেতে বসে। পথচারী, শ্রমিক, চালক—নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে দোকানটি যেন পরিচিত এক ঠিকানা।
দোকানের এক কোণে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে ক্রেতাদের আপ্যায়ন করছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব মো. ফাইজুল হোসেন। পাশে ব্যস্ত তার স্ত্রী মোসলেমা খাতুন। দুজনের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে সন্ধ্যার নাস্তা। ছোট্ট এই দোকানই এখন তাদের সংসারের ভরসা, জীবনের লড়াইয়ের মঞ্চ।
কাগজেই বাজেট বড়
১৬ জুন ২০২৬
প্রথম দেখায় ফাইজুল হোসেনকে খুব সাধারণ একজন মানুষ বলেই মনে হবে। সাদা শার্ট, পরিপাটি লুঙ্গি, কাঁচা-পাকা দাড়ি আর মেহেদি রঙে রাঙানো চুল। কিন্তু তার মুখের হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ সংগ্রাম, হারানোর বেদনা আর টিকে থাকার এক অদম্য গল্প।
কথা বলতে বলতে হঠাৎই তিনি ফিরে যান অতীতের পাতায়। ‘জীবনে অনেক কিছু দেখলাম বাবা’—বলেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। নীরবতার ফাঁকেই যেন ভেসে ওঠে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতগুলোর গল্প।
বহু বছর আগে তিনি হারিয়েছেন তার প্রথম স্ত্রীকে। রেখে গেছেন দুই সন্তান। সেই সন্তানদের একজন ছিল পরিবারের গর্ব, স্বপ্ন আর আশার প্রতীক। অনেক পরিশ্রম করে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) পদে নির্বাচিত হয়েছিল সে। পরিবারের সবাই তখন আনন্দে ভাসছিল। কিন্তু চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগেই এক সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় তার প্রাণ।
সেই স্মৃতি এখনও ফাইজুল হোসেনকে তাড়া করে ফেরে। কথা বলতে বলতে তার চোখ ভিজে ওঠে। একজন বাবার কাছে সন্তানের মৃত্যু যে কত বড় বেদনা, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
অন্য ছেলে বিয়ে করে আলাদা সংসার গড়েছেন। সময়ের প্রয়োজনে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন ফাইজুল। বর্তমান সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে আছেন। আর ছেলেটি ইজিবাইক চালিয়ে সংসারে সহযোগিতা করছে। এখন বাবা-মায়ের নতুন চিন্তা ছেলের বিয়ে।
জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে রাজমিস্ত্রির কাজ করে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ইট, বালু আর সিমেন্টের সঙ্গে যুদ্ধ করেই চলেছে জীবন। সেই শ্রমেই বড় করেছেন সন্তানদের। কিন্তু বয়সের ভার আর অসুস্থতা ধীরে ধীরে তাকে নির্মাণশ্রমের কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
পরিবারের সদস্যরা চাননি তিনি আবার কোনো কষ্টের কাজে নামুন। এমনকি রাস্তার পাশে দোকান বসানো নিয়েও আপত্তি ছিল তাদের। কিন্তু সংসারের চাহিদা তো থেমে থাকে না।
তাই প্রতিদিন বিকেল ৫টা বাজলেই তিনি চলে আসেন এই ছোট্ট ছাপড়ি দোকানে। রাত সাড়ে ১০টার পর্যন্ত চলে বিক্রি।
শীতকালে ব্যবসা কিছুটা ভালো হয়। প্রতিদিন তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকার বিক্রি হয়। কিন্তু মৌসুম বদলালে বিক্রিও কমে যায়। এখন দিনে বিক্রি হয় প্রায় এক হাজার দুইশ থেকে দেড় হাজার টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে হাতে থাকে চার থেকে পাঁচশ টাকা।
এই সামান্য আয় দিয়েই চলছে সংসার। তবু তার কণ্ঠে নেই কোনো অভিযোগ, নেই হতাশার সুর। মৃদু হেসে তিনি বলেছেন, ‘কষ্ট হয়, কিন্তু আল্লাহর রহমতে কোনোমতে চলে যায়।’
জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তাকে সমাজ নিয়েও ভাবায়। কথার ফাঁকে ফাঁকে উঠে আসে তার উদ্বেগ। এখন সমাজটা মাদকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তরুণরা যেভাবে মাদকাসক্ত হচ্ছে, তাতে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় লাগে। আবার মোবাইল ফোনও অনেককে খারাপ পথে নিয়ে যাচ্ছে।
তার কথায় নেই কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, নেই অর্থনীতির জটিল তত্ত্ব। তিনি একজন সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে দেখেন দেশকে, দেখেন সমাজকে।
যখন দেশের বাজেট, অর্থনীতি কিংবা উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়। তখন তার ভাবনা খুবই সরল। ‘বাবা, আমরা বাজেট-টাজেট কিছু বুঝি না। গরিব মানুষ। ডাল-ভাত খেয়ে, পরে কোনোমতে বেঁচে থাকতে পারলেই হলো। আমাদের কাছে বাজেট মানে বাজারের জিনিসপত্রের দাম। দাম যেন হাতের নাগালে থাকে, এটাই চাই।’
তার এই কথাগুলো যেন শুধু ফাইজুল হোসেনের নয়, দেশের লাখো নিম্নআয়ের মানুষের মনের ভাষা। প্রবৃদ্ধির হার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিংবা উন্নয়নের পরিসংখ্যান তাদের জীবনে খুব বেশি প্রভাব ফেলে না। তারা শুধু জানতে চায়—আজকের আয় দিয়ে আগামীকালের বাজার হবে কি না, পরিবারের জন্য দু-মুঠো খাবার জোগাড় করা যাবে কি না।
রাত বাড়তে থাকে। দোকানে ক্রেতার ভিড়ও ধীরে ধীরে কমে আসে। শেষ কয়েকটি পিঠা ভাজা হচ্ছে চুলায়। রাস্তার বাতির আলো এসে পড়ে ফাইজুল হোসেনের মুখে। তাকে দেখে মনে হয়, তিনি শুধু একজন দোকানি নন। তিনি এই দেশের সংগ্রামী মানুষের প্রতিচ্ছবি।
রাস্তার ধারের সেই ছোট্ট ছাপড়ি দোকানে বসে তিনি শুধু পিঠা, পিয়াজু কিংবা ছোলা বিক্রি করেন না। প্রতিদিন নতুন করে লড়াই করেন জীবন নামের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে। হারিয়েছেন প্রিয়জন, হারিয়েছেন স্বপ্ন। তবুও থেমে যাননি।
হয়তো এ কারণেই ফাইজুল হোসেনের গল্প আলাদা। কারণ এটি শুধু একজন মানুষের গল্প নয়। এটি বেঁচে থাকার গল্প, ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, অদম্য মানুষের গল্প।
আর তার সেই নীরব সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই দেশের প্রকৃত শক্তি লুকিয়ে আছে এমন অসংখ্য সাধারণ মানুষের ঘামে, ত্যাগে আর হার না মানা জীবনযুদ্ধে।








