রাজশাহীর ২১৪ প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসা বর্জ্য নদীতে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজশাহীতে প্রতিদিন বিপজ্জনক তরল চিকিৎসা বর্জ্য নগরীর ড্রেন ও সরু খাল হয়ে নদীতে গিয়ে পড়ছে। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা না থাকায় রক্ত, শরীরের বিভিন্ন তরল, রাসায়নিক পদার্থ ও জীবাণুযুক্ত বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় পরিবেশে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে শুধু পানি ও পরিবেশ দূষণ নয়, নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকিও ক্রমে বাড়ছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, রাজশাহীতে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ২১৬টি। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তরল বর্জ্য শোধনের জন্য কার্যকর এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) রয়েছে মাত্র দুটিতে। অর্থাৎ ২১৪টি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানেই তরল মেডিকেল বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা নেই। রাজশাহীর লক্ষ্মীপুর এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে চিকিৎসাসেবা দেওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আশপাশের ড্রেনে দেখা গেছে তরল বর্জ্য নিষ্কাশনের চিহ্ন। নগরীর বড় বড় ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বর্জ্যও ড্রেনের মাধ্যমে বাইরে চলে যাওয়ার চিত্র দেখা গেছে। কোথাও কোথাও তরল বর্জ্যের পাশাপাশি চিকিৎসায় ব্যবহৃত অন্যান্য বর্জ্যও পড়ে থাকতে দেখা যায়। নগরীর ড্রেন ও সরু খালগুলো দিয়ে প্রবাহিত পানি শেষ পর্যন্ত পার্শ্ববর্তী পবা উপজেলার বারনই নদীতে গিয়ে পড়ছে। ফলে চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তরল বর্জ্যের দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে বিস্তৃত এলাকায়।
পবা উপজেলার বাসিন্দা আবদুস সালাম বলেছেন, এলাকার ড্রেনে প্রায়ই মেডিকেল বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়। রক্ত, তুলা, গজসহ বিভিন্ন বর্জ্য ড্রেনের পানিতে ভাসতে থাকে। এসব বর্জ্য থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছড়ায়। অনেক সময় বাধ্য হয়ে ওই পানিতে নামতে হয়। তখন সিরিঞ্জ বা কাচের বোতলের মতো বর্জ্যে পা কেটে যায়। পরে ওই স্থানে চুলকানি ও ঘা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মর্জিনা বেগম বললেন, ড্রেনের পানি অত্যন্ত নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত। ওই পানিতে নামলে কিংবা পা ভিজলে পরে শরীরে চুলকানি শুরু হয়। অনেক সময় পায়ে ছোট ছোট ঘা হয়ে যায়।
রুহুল আমিন নামে আরেক বাসিন্দা জানালেন, ড্রেনে শুধু ময়লা পানি নয়, চিকিৎসার পর ব্যবহৃত বিভিন্ন বর্জ্যও দেখা যায়। এসব বর্জ্য পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়। কখনো ড্রেনের পানি উপচে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়লে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ওই পানি শরীরে লাগলে চুলকানি দেখা দেয় ও ঘা হয়।
রাজশাহী বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বললেন, বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ বিষয়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেছেন, বর্তমানে তারা একটি হাসপাতালের একটি বাথরুমে এসব বর্জ্য কিছুটা পরিশোধন করে ড্রেনে দেন। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত হওয়ায় সেখানে চাইলেই ইটিপি বসানো সম্ভব নয়। সময় দেওয়া হলে তারা ইটিপি স্থাপনের উদ্যোগ নেবেন বলেও জানালেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের তরল বর্জ্য সাধারণ বর্জ্যের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এসব বর্জ্যে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু ও রাসায়নিক উপাদান থাকতে পারে। সেগুলো যথাযথভাবে শোধন না করে নিষ্কাশন করলে পানি ও মাটি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যেও দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. মিজানুর রহমান বলেছেন, হাসপাতালের তরল বর্জ্যে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু থাকতে পারে। এসব বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় নিষ্কাশন করা হলে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম না মানা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তরল বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর রাজশাহীর উপপরিচালক মোছা. তাছমিনা খাতুন বললেন, নিয়ম অনুযায়ী তরল বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা না মানলে অভিযান পরিচালনা করা হবে। এর আগে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা ও সতর্কবার্তাও দেওয়া হচ্ছে।
রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এস আই এম রাজিউল করিম বলেছেন, চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে হবে। যারা নিয়ম মানছে না, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



