মহাসড়কে গাড়ির বদলে চলছে নৌকা

ছবি: আগামীর সময়
টানা আট দিনের ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের রামু উপজেলায় দেখা দিয়েছে ভয়াবহ মানবিক সংকট। বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে প্রায় অর্ধলাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে তীব্র নদীভাঙনে মুহূর্তেই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, আবাদি জমি ও গ্রামীণ সড়ক। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ, কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের কয়েকটি অংশ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় সেখানে যানবাহনের পরিবর্তে নৌকায় চলাচল করছেন মানুষ।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, কাউয়ারখোপ, রাজারকুল ও দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল। টানা বর্ষণে বাঁকখালী নদী ও এর শাখা-প্রশাখার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে আশপাশের জনপদ প্লাবিত হয়েছে। অনেক এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন বাসিন্দারা। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বহু পরিবার আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি কিংবা উঁচু স্থানে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে।
পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগও দিন দিন বাড়ছে। রান্নাবান্না প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর অভাব এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় চরম দুর্ভোগে রয়েছেন তারা। সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা।
এদিকে প্লাবনের পাশাপাশি নদীভাঙন পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। প্রবল স্রোতে নদীতীরবর্তী এলাকায় একের পর এক বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের। প্লাবনের কারণে স্থানীয় সড়ক, কাঁচা রাস্তা এবং বিস্তীর্ণ ফসলি জমিরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমন ধানের বীজতলা, বিভিন্ন সবজিক্ষেত ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নদীভাঙনের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে, কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের দোছড়ি দক্ষিণকূল পূর্বপাড়া এলাকায়। সেখানে প্রবল স্রোতে নদীর পাড় ধসে ইতোমধ্যে কয়েকটি বসতবাড়ির বড় অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আরও বহু বাড়ি এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা সিরাজুল হক বলেছেন, ‘প্রবল বর্ষণে আমার শেষ সম্বল বসতবাড়ির অর্ধেক নদীগর্ভে চলে গেছে। বাকি অংশও ভাঙনের মুখে। কখন পুরো বাড়িটাই নদীতে হারিয়ে যাবে, সেই আতঙ্কে দিন কাটছে।’
একই এলাকার দিনমজুর মোজাম্মেল হক বললেন, ‘প্রতিবছর নদীভাঙন হয়। এখন ভাঙন আমার বাড়ির উঠোন পর্যন্ত চলে এসেছে। শুধু অপেক্ষা করছি, কখন নদী আমার বাড়িটাও গিলে ফেলে। পরিবার নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেব, সেই দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুম হয় না।’
কচ্ছপিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু মোহাম্মদ ঈসমাইল নোমান জানালেন, টানা বর্ষণ ও নদীর তীব্র স্রোতের কারণে ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী কয়েকটি এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে একাধিক পরিবারের বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের কবলে পড়ছে। দ্রুত স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
মিঠাছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা ও ক্রীড়াবিদ সাঈদ হোসেন আকাশ জানিয়েছেন, মিঠাছড়ি ইউনিয়নের প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের কয়েকটি অংশ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় সেখানে গাড়ির পরিবর্তে নৌকায় চলাচল করছেন স্থানীয়রা। এতে কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং জরুরি সেবায় যাতায়াত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কাউয়ারখোপ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শামশুল হক বলেছেন, তার ইউনিয়নের মনিরঝিল, কাউয়ারখোপ ও ফরেস্ট অফিসসংলগ্ন বাঁকখালী নদীর তীরবর্তী এলাকায় তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতের পাশাপাশি পানিবন্দি মানুষের মধ্যে জরুরি খাদ্যসহায়তা ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, শুধু ত্রাণ বিতরণে সংকটের সমাধান হবে না। নদীভাঙন রোধে স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দ্রুত পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. জিল্লুর রহমান নিশ্চিত করেছেন, উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি প্লাবন ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে সরকারি সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।




