জীবননগরে শীতের আগমনী বার্তা, খেজুর গাছ প্রস্তুতে ব্যস্ত গাছিরা

শীতের আগমনী বার্তা প্রকৃতিতে। সকালের শিশিরভেজা ঘাস আর হালকা কুয়াশায় জানান দিচ্ছে শীতের আগমন। এ সময় খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার গাছিরা। গাছের ডালপালা ছাঁটা, গা পরিষ্কার করা ও রস নামানোর জন্য নলি বসানোর কাজ চলছে। কয়েক দিনের মধ্যেই গাছে গাছে ঝুলবে মাটির হাঁড়ি, শুরু হবে রস সংগ্রহ।
একসময় জীবননগরের গ্রামগুলোতে প্রচুর খেজুরগাছ দেখা যেত। শীত এলেই গাছিরা বিকেলে গাছে মাটির হাঁড়ি বেঁধে দিতেন। সকালে সেই হাঁড়ি থেকে রস সংগ্রহ করে বাড়িতে ফিরতেন। এরপর সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলত গুড় ও পাটালি তৈরির কাজ। খেজুরের গুড়ের মিষ্টি গন্ধে মুখর হয়ে উঠত গ্রামের পরিবেশ। কেউ রস বিক্রি করতেন, কেউ গুড় তৈরি করে বাজারে নিতেন, আবার কেউ স্বজনদের বাড়িতে পাঠাতেন।
কালের বিবর্তনে সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে খেজুরগাছ কাটাসহ নানা কারণে গাছের সংখ্যা কমছে। তবু বংশপরম্পরায় চলে আসা এ পেশা আঁকড়ে ধরে আছেন অনেক গাছি।
জীবননগর উপজেলার উথলী গ্রামের আনোয়ার মল্লিকের ছেলে কাদের মল্লিক বলেন, ১০ দিন আগে তিনি গাছ প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছেন। গাছের ময়লা ও অপ্রয়োজনীয় ডালপালা ছেঁটে ফেলা হয়েছে। ধারালো দা দিয়ে খেজুরগাছের ওপরের অংশ পরিষ্কার করে নলি বসানোর কাজও প্রায় শেষ। কিছুদিনের মধ্যে গাছে মাটির হাঁড়ি বাঁধা হবে। এরপর শুরু হবে রস সংগ্রহ ও তা থেকে গুড়-পাটালি তৈরির কাজ।
তবে উৎপাদন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। কাদের মল্লিক বলেন, এক কেজি গুড় তৈরি করতে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা খরচ হয়। অথচ তা বিক্রি করতে হয় ২০০ থেকে ২৩০ টাকা দরে। খরচের তুলনায় লাভ কম হওয়ায় চাষিরা গুড় তৈরি করতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
দেহাটি গ্রামের গাছি লিয়াকত হোসেন বলেন, শীতের সঙ্গে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রসের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আরও দুই সপ্তাহের মধ্যে গাছ থেকে রস সংগ্রহ শুরু হবে। তার নিজের ৪০টি খেজুরগাছ রয়েছে। পাশাপাশি আরও ৪০টি গাছ বর্গা নিয়েছেন। একটি গাছ একবার ছাঁটার পর তিন থেকে চার দিন রস সংগ্রহ করা যায়।
কাটাপোল গ্রামের গাছি আবু তালেব বলেন, যেভাবে খেজুরগাছ কমে যাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে এ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। খেজুরের রস ও গুড়ের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে তালগাছের মতো বেশি বেশি খেজুরগাছ লাগাতে হবে এবং সেগুলোর যথাযথ পরিচর্যা করতে হবে।
যাদবপুর গ্রামের ইসমাইল হোসেন বলেন, জীবননগরের খেজুরের গুড়ের চাহিদা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে। প্রতিবছর গ্রাম থেকে ট্রাকভর্তি গুড় দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়।
শুধু রস ও গুড় নয়, খেজুরের রস থেকে পাটালি ও ভিনেগারও তৈরি হয়। শীতকালে খেজুরের রসের পায়েস ও পিঠা গ্রামবাংলার খাদ্যসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ স্বাদ নিতে শহর থেকেও অনেকে গ্রামে আসেন। কিন্তু খেজুরগাছ কমে যাওয়ায় এ ঐতিহ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে খেজুরগাছ কাটা হচ্ছে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নূরুল ইসলাম বলেন, এ বছর জেলায় রস সংগ্রহের জন্য ২ লাখ ৭২ হাজার খেজুরগাছ প্রস্তুত করা হচ্ছে। শীত মৌসুমে প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে ১০ কেজি গুড় পাওয়া যায়। সে হিসাবে জেলায় গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন। শীতকালীন এ মৌসুমি পেশার সঙ্গে জেলার প্রায় ৩০ হাজার চাষি যুক্ত রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, সারা দেশে চুয়াডাঙ্গার গুড়ের চাহিদা রয়েছে। এবারও জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে এ গুড় সরবরাহ করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।



