৬ কোটি টাকার রিসোর্ট গুঁড়িয়ে দিল কউক
- মেরিন ড্রাইভে অনুমোদনহীন হোটেল-রিসোর্টের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান শুরু
- ৮০ কিলোমিটারে আড়াই হাজার স্থাপনা, অধিকাংশের অনুমোদন নেই

ছবি: আগামীর সময়
কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে অনুমোদনহীন হোটেল-রিসোর্টের বিরুদ্ধে যৌথ উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। অভিযানের প্রথম দিনেই উখিয়ার ইনানী সৈকত এলাকায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে চারতলার একটি রিসোর্ট ভবন।
ভবনমালিক শহিদুল হকের দাবি, প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি কিছুদিনের মধ্যেই উদ্বোধনের কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই ভেঙে ফেলা হলো পুরো স্থাপনা।
আজ সোমবার দুপুরে কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের ইনানী নৌবাহিনীর জেটির পূর্ব পাশে এ অভিযান চালানো হয়।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) নেতৃত্বে এতে অংশ নেয় জেলা প্রশাসন, পুলিশ, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও আনসার বাহিনী।
ভবনটি তারকা হোটেল রয়েল টিউলিপের পূর্ব পাশে এবং বে ওয়াচ হোটেলের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত। সকাল ১১টার দিকে সেখানে খননযন্ত্র নিয়ে আসা হয়। অভিযান শুরুর খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের বাসিন্দারা ভিড় করেন। প্রথমে ভবনের নিচে ও দুই পাশে থাকা ১০ থেকে ১২টি দোকানঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে চারতলা ভবনের কাচ ভেঙে পিলার ধ্বংসের কাজ শুরু হয়।
কউক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অবৈধভাবে নির্মিত ভবনটি নিজ উদ্যোগে ভেঙে ফেলতে মালিকপক্ষকে চারবার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নোটিশের পরও স্থাপনা অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ কারণে যৌথভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে।
তবে ভবনমালিক শহিদুল হক দাবি করেন, তিনি ২০১৪ সালে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অনুমতি নিয়ে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু করেন। সম্প্রতি নিচতলায় কয়েকটি দোকান, দ্বিতীয় তলায় রেস্তোরাঁ এবং তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় পর্যটকদের থাকার জন্য কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছিল। প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি শিগগিরই চালুর পরিকল্পনা ছিল।
নোটিশের জবাব না দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে শহিদুল হক বললেন, ‘চারটি নোটিশেরই জবাব দিয়েছি। ভবন নির্মাণের বিপরীতে কাগজপত্রও আছে, কিন্তু কেউ তা আমলে নিচ্ছে না।’
গত ১৭ অক্টোবর সকালে মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সৈকতে তিনতলা টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লেগে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার পর মেরিন ড্রাইভের পাশে অনুমোদনহীন হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণ, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে যৌথ অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত নেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
কউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেছেন, ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে প্রায় ২০০টি রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগ কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি এবং অনুমোদনহীন। অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে সম্প্রতি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বারবার নোটিশ দেওয়ার পরও স্থাপনা সরানো না হওয়ায় যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে।
তিনি স্পষ্ট করেন, ‘মেরিন ড্রাইভে অবৈধ কোনো স্থাপনা রাখতে দেওয়া হবে না।’
কউকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে কক্সবাজার পৌরসভাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভবন নির্মাণের জন্য প্রায় ১ হাজার ৭০০টি নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অথচ মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে অবকাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ থাকলেও সেখানে ইতিমধ্যে প্রায় আড়াই হাজার স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে ২০০টির বেশি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। তারকা মানের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশেরই বৈধ অনুমোদন নেই বলে জানিয়েছেন কউক চেয়ারম্যান।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেছেন, মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে অনেক অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) সমুদ্রসৈকতের ৫০০ গজের মধ্যে এবং শহর এলাকায় পৌরসভার ৩০০ গজের মধ্যে রিসোর্ট, কটেজসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ। এ কারণে মেরিন ড্রাইভের শতাধিক রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ কউকের অনুমোদন পায়নি।
তার ভাষ্য, ‘কউকের অনুমোদন না পেলে ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সরকারি একাধিক দপ্তরের অনুমতি পায় না। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা অবৈধ রিসোর্ট-কটেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কাগজপত্র যাচাই করছি। পাশাপাশি অবৈধভাবে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যৌথভাবে উচ্ছেদ অভিযানও চালানো হচ্ছে।’
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানের কিছু কাগজপত্র আছে, কিন্তু সব অনুমোদন নেই, সেসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে ব্যবসায়ীরা ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।
কউকের অনুমোদন ছাড়াও মেরিন ড্রাইভের পাশে পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, সম্প্রতি এ ধরনের ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্তোরাঁকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশের জবাব না দেওয়ায় ১৪টি রিসোর্টকে জরিমানা এবং দুটি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। ১৯৯৯ সালে মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন সৈকত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে সরকার।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ৫৮টি হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, রিসোর্ট ও কটেজকে প্রায় দেড় কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সময়ে ইসিএ এলাকায় অবস্থিত শতাধিক হোটেলের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা হয়েছে।
এদিকে, মেরিন ড্রাইভের পাশে অনুমোদনহীন স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি সৈকতের বালিয়াড়ি ও পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় রিসোর্ট-রেস্তোরাঁ গড়ে তোলা এবং সৈকত দখল করে ব্যবসা চালানোর অভিযোগও রয়েছে। ঝাউবাগান বিচ রেস্টুরেন্ট ও সাদাবালির মতো স্থাপনার প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বললেন, ‘মেরিন ড্রাইভে ব্যাঙের ছাতার মতো বেশ কিছু রিসোর্ট-কটেজ নির্মিত হয়েছে। আমরাও চাই অবৈধ হোটেল-রিসোর্টগুলোকে আইনের আওতায় আসুক। কারণ, টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে পুড়ে পর্যটকের প্রাণহানির ঘটনায় কক্সবাজারে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।’
কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেছেন, তাদের সমিতিতে সদস্যসংখ্যা ১৮৭। সমিতির তালিকাভুক্ত প্রায় সব হোটেল-গেস্টহাউসের অনুমোদন রয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আছে কি না, তা তার জানা নেই।




