হলে শিবির ও হল সংসদ নেতাদের বেআইনি তল্লাশি
‘তারা জোর করে রুমে ঢুকে বলে, এখানে মেয়ে আছে’

রাত পেরিয়ে ভোর। ক্যাম্পাস নিস্তব্ধ, চারপাশে নীরবতা। ঠিক সেই সময় হঠাৎই দরজায় জোরালো ধাক্কা, ‘রুমে মেয়ে আছে’- এমন অভিযোগ তুলে শুরু হয় তল্লাশি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শহীদ জিয়াউর রহমান হলে ঘটে যাওয়া এ ঘটনাই জন্ম দিয়েছে জোর আলোচনা-সমালোচনার। অনেকের মতে, এ যেন গায়ে মানে না আপনি মোড়ল অবস্থা।
গত শনিবার ভোরে এখতিয়ার-বহির্ভূত ওই তল্লাশির ঘটনা ঘটান ছাত্রশিবির কর্মী ও হল সংসদের নেতারা। এ ঘটনায় হলটির ছাত্র সংসদের সহসাধারণ সম্পাদকসহ (এজিএস) তিনজনের আবাসিকতা সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়েছে। কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে হল সংসদের সহসভাপতিকে (ভিপি), অধিকতর তদন্তে গঠন করা হয়েছে একটি কমিটিও। ওই হলের প্রাধ্যক্ষ (প্রভোস্ট) অধ্যাপক মাহবুবার রহমান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
সাময়িকভাবে আবাসিকতা স্থগিত হওয়া শিক্ষার্থীরা হলেন— হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের মো. ইসরাফিল হোসাইন (এজিএস, জিয়া হল সংসদ), আরবি বিভাগের মো. সাকিব জুবায়ের (সাংস্কৃতিক সম্পাদক, জিয়া হল সংসদ) এবং উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের মো. ফোরকান হাফিজ জীম। এছাড়া জিয়াউর রহমান হল সংসদের ভিপি মো. মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে কেন আবাসিকতা বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে দেওয়া হয়েছে কারণ দর্শানোর নোটিশ।
বিষয়টি নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা হয় জিয়া হলের একাধিক আবাসিক শিক্ষার্থী ও হলটির আবাসিক শিক্ষকদের সঙ্গে। জানা গেছে, শনিবার ভোরে জিয়াউর রহমান হলের ১২১ নম্বর কক্ষে ‘নারী থাকার অভিযোগ’ তুলে অনুমতি ছাড়াই তল্লাশি চালান ছাত্রশিবির সমর্থিত হল সংসদের এজিএস ইসরাফিল হোসাইনের নেতৃত্বে কয়েকজন শিক্ষার্থী।
বিষয়টি জানাজানি হলে ওইদিন রাত সাড়ে ৭টার দিকে সাধারণ শিক্ষার্থী ও হল সংসদের নেতাদের মধ্যে শুরু হয় বাগবিতণ্ডা। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাত ১১টার দিকে বৈঠকে বসেন হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবর রহমান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মাহবুবর রহমানসহ সংশ্লিষ্টরা।
বৈঠকে শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও হলে অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগে তিন শিক্ষার্থীর আবাসিকতা সাময়িকভাবে স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
যে কক্ষে তল্লাশি চালানো হয়, ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষার্থী আলিম মৃধা। তিনি তুলে ধরলেন ভীতিকর এক চিত্র। ‘‘ইসরাফিলসহ কয়েকজন দরজায় জোরে ধাক্কা দেয়। আমরা ঘুমিয়ে থাকায় দরজা খুলতে দেরি হয়। পরে তারা জোর করে রুমে ঢুকে বলে, ‘এখানে মেয়ে আছে’। তবে তল্লাশি করে কাউকে না পেয়ে চলে যায়।’’
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানান, ‘তল্লাশি’ করতে আসা শিক্ষার্থীরা দরজা খোলামাত্রই হাতে মোবাইল ফোনসহ ভেতরে ঢুকে পড়ে। তখন তাদের মোবাইল ফোনগুলোর ভিডিও ক্যামেরা চালু ছিল দাবি করে একই কক্ষের আরেক শিক্ষার্থী সন্দীপ কুমার শীলের অভিযোগ, কিছু না পাওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে চালানো হয়েছে অপপ্রচার।
যার বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই ইসরাফিল হোসাইন জানালেন ঘটনার সূত্রপাতের কথা। তার ভাষ্য, একটি সূত্র থেকে হলে নিয়মবর্হিভূতভাবে এক নারীর প্রবেশের তথ্য পাওয়ায় ভিপি ও জিএসের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি যাচাই করতে ওই কক্ষে যান তারা। তবে সেখানে কোনো নারীর খোঁজ না পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন ইসরাফিল।
একই ধরনের তথ্য দিলেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা মোজাম্মেল হক। ‘ফজরের আগে কেউ একজন হলে মেয়ে নিয়ে আসার বিষয়ে জানালে বিষয়টি জিএস ও এজিএসকে জানাই। আর এরকম কিছু হলে গোপনে মিটমাট করে ফেলার পরামর্শ দিই। এটা যাতে আলোচনার বিষয় না হয় সেটাই চেয়েছিলাম।’
‘রাত গভীর হওয়ায় হল প্রশাসনের কাউকে জানানো হয়নি’, যোগ করেন মোজাম্মেল।
আলোচিত এ ঘটনায় জড়িতদের মধ্যে কারও হল সংসদের পদ বাতিল করা তার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না বলে জানান হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবার রহমান। তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। তবে খুব দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।
হল প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া তল্লাশি চালানো সম্পূর্ণ এখতিয়ারবহির্ভূত বলেও জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর। ‘হলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তথা প্রভোস্টের অনুমতি ছাড়া স্বয়ং প্রক্টরও হলে চালাতে পারেন না তল্লাশি। পাশাপাশি এটি হল-সংক্রান্ত বিষয় হওয়ায় আগে ব্যবস্থা নেবে হল প্রশাসন।’ কোনোভাবেই ‘মব’ তৈরি করে কাউকে সুযোগ দেওয়া হবে না হেনস্তার—এমন হুঁশিয়ারি তার। ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা আর না ঘটে সেজন্য উপাচার্যের নির্দেশে প্রতিটি হল সংসদকে দেওয়া হবে নোটিশ, যোগ করেন তিনি।

