কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুন
১০ প্রাণহানির প্রশ্নবিদ্ধ তদন্ত
- শর্টসার্কিট থেকে আগুন, পরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ধারণা
- অনুমোদনহীন রিসোর্টে প্রাণহানি, মামলার ধারা নিয়ে প্রশ্ন

ছবি: আগামীর সময়
১০ জনের প্রাণহানি। পুড়ে ছাই তিনতলা রিসোর্টের বড় অংশ। আগুনের কারণ নিয়ে একাধিক ধারণা, কিন্তু নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেই। প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা ও পরিবেশগত অনুমোদন ছাড়াই চলছিল পর্যটকদের আবাসন ব্যবসা। অথচ এত বড় দুর্ঘটনার পর দায়ের করা মামলায় দুই মালিকের একজনের নাম নেই। অভিযোগের ধারা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবীরা। প্রধান আসামি ও রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়া পলাতক। অপর মালিক নিয়াজ মোর্শেদের স্পষ্ট কোনো তথ্য কোথাও নেই।
কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টে আগুনে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় এভাবেই একের পর এক প্রশ্ন সামনে আসছে। আগুনের সূত্রপাত, ভবনের নিরাপত্তাব্যবস্থা, অনুমোদনহীন ব্যবসা পরিচালনা এবং মালিকদের দায়। কোনো প্রশ্নেরই এখনো চূড়ান্ত উত্তর মিলছে না। ফলে ১০ প্রাণহানির এই ঘটনায় তদন্তের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
গত ১৭ অক্টোবর শনিবার সকালে মেরিন ড্রাইভের পাশে রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৩১ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত তিনতলা ভবনটির দোতলা ও তিনতলার আটটি কক্ষে পর্যটকেরা ছিলেন। নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ ও কর্মীদের থাকার জায়গা। আগুনে ভবনের কাঠের মেঝে, দেয়াল, সিঁড়ি ও রেস্তোরাঁর বর্ধিত অংশ পুড়ে যায়। পরে সেখান থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমানের ভাষ্য, গ্রেপ্তার সহকারী ব্যবস্থাপককে জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিচতলার একটি ফ্রিজে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে আগুন ছড়িয়ে পড়লে রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে।
তবে এটিই আগুনের চূড়ান্ত কারণ কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উখিয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রিমন ঘোষ বলেন, আগুনের সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে আরও সময় লাগবে।
পুলিশের ধারণা, রিসোর্টের গুদামে থাকা দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তীব্র বাতাস ও ভবনের কাঠের অবকাঠামোও আগুনের বিস্তার ত্বরান্বিত করে থাকতে পারে। তবে গুদামে কী ধরনের রাসায়নিক পদার্থ ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটিও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন এবং পরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের বিষয়টি সামনে এসেছে। বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হবে।
রিসোর্টটির পাশের চা-কফির দোকানের মালিক গিয়াস উদ্দিনের দাবি, ঘটনার সকালে বিকট শব্দ শুনে বাইরে এসে তিনি রিসোর্টে আগুন দেখতে পান। তখন সেখানে লোকজন ছোটাছুটি করছিলেন। আগুনে তার দোকানের একটি ফ্রিজ ও কাঠের কিছু অংশও পুড়ে যায়। জালিয়াপালং ইউনিয়নের আনসার-ভিডিপি কমান্ডার মোহাম্মদ আজিজও বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন। তবে শব্দের উৎস সম্পর্কে তারা নিশ্চিত নন।
প্রায় ২০ শতক জমির ওপর নির্মিত রিসোর্টটির কক্ষের মেঝে, দেয়াল ও সিঁড়ির বড় অংশ ছিল কাঠের। সড়কের দিকে গাছের খুঁটির ওপর তৈরি করা হয়েছিল রেস্তোরাঁর বর্ধিত অংশ। আগুনের বিস্তার ও প্রাণহানিতে এসব অবকাঠামোর ভূমিকা ছিল ভয়াবহ।
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়েই ব্যবসা পরিচালনা করছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল না।
ইউনিয়ন পরিষদের নথি অনুযায়ী, গত ২২ জুলাই তানভীর সুলতান মিয়ার নামে ট্রেড লাইসেন্সটি দেওয়া হয়। এতে তার ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর মীরপাড়া। লাইসেন্সের মেয়াদ চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত। লাইসেন্স ফি, মূল্য সংযোজন কর ও বাণিজ্যিক কর মিলিয়ে আদায় করা হয় দুই হাজার টাকা।
জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম ছৈয়দ আলম বলেছেন, ইউনিয়ন এলাকায় ব্যবসা পরিচালনার জন্য নির্ধারিত ফি নিয়ে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়। টুপটুপ রিসোর্টের ক্ষেত্রেও তাই করা হয়েছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের পর প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য অনুমোদন না থাকার বিষয়টি জানা গেছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের একটি ট্রেড লাইসেন্স থাকলেও পর্যটকদের আবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা ও অন্যান্য অনুমোদন নিশ্চিত হয়েছিল কি না, তা যাচাই করার দায়িত্ব কার ছিল এ প্রশ্নও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে, আবাসিক রিসোর্টে আগুন লাগলে পর্যটকদের নিরাপদে বেরিয়ে আসার ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমনপথ এবং অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম যথাযথ ছিল কি না, তা তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে, রিসোর্টটির ওয়েবসাইটের ‘অ্যাবাউট’ অংশে তানভীর সুলতান মিয়া ও নিয়াজ মোর্শেদের নাম ও ছবি রয়েছে। সেখানে দুজনকেই মালিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তানভীর মিয়ার নাম থাকলেও নিয়াজ মোর্শেদের নাম নেই।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, রিসোর্টের সত্ত্বাধিকারী তানভীর সুলতান মিয়া, প্রধান ব্যবস্থাপক সাঈদ আহাম্মেদ, ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাঈদ এবং সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমনকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। গত ১৭ অক্টোবর মামলাটি করেন উখিয়া থানার উপ-পরিদর্শক আশিষ সূত্রধর। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রিমন ঘোষ।
দুই মালিকের মধ্যে একজনের নাম বাদ পড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি আতিকুর রহমান বলেন, প্রথমে একজন মালিকের নাম জানতে পেরে তাকে আসামি করা হয়েছে। পরে আরেকজনের নাম সামনে এসেছে। তদন্তে আরও কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। রিসোর্টের কাগজপত্র আগুনে পুড়ে যাওয়ায় ট্রেড লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহে সমস্যা হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে নথি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
নিয়াজ মোর্শেদের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা রিমন ঘোষ বলেন, তদন্ত চলছে। এ পর্যায়ে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়।
ঘটনার পর থেকে প্রধান আসামি তানভীর সুলতান মিয়া পলাতক। তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তিনি বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থান করছেন। অন্য মালিকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থান সম্পর্কেও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমন। তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেছে পুলিশ। তবে রিমান্ড শুনানি এখনো হয়নি।
মামলার এজাহার পর্যালোচনা করে আসামি নির্বাচন ও অভিযোগের ধারা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবী সেজান এহসান। তার মতে, এত মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় কেবল অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগ যথেষ্ট কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা দরকার।
তার ভাষ্য, রিসোর্ট নির্মাণ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা এবং পরিবেশগত বিধি মানা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের কেন্দ্রে থাকা উচিত। এজাহারে মালিকদের ভূমিকা ও কর্মীদের দায় নির্ধারণের বিষয়টিও আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
তার মতে, এ ঘটনায় দণ্ডবিধির ২৮৫ ও ৪৩৬ ধারা এবং অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইনের ১৮ ও ১৯ ধারা যুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারত। তবে মামলার বাদী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কেন এসব ধারা যুক্ত করেননি, সে বিষয়ে তাদের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টে ঠিক কতজন পর্যটক ছিলেন, তা নিয়েও স্বজন ও পুলিশের হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। ফলে ১০ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি নিখোঁজের কোনো ঘটনা আছে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৬ অক্টোবর রাতে নারী ও শিশুসহ ২১ জন পর্যটক রিসোর্টটিতে ছিলেন। পরদিন ভোরে আইরিন জাহান ও ইসরাত জাহান সৈকতে বেড়াতে যাওয়ায় আগুন লাগার সময় সেখানে ছিলেন ১৯ জন।
স্বজনদের হিসাব অনুযায়ী, তাদের মধ্যে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, ছয়জন আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন এবং দুজন লাফ দিয়ে প্রাণে বাঁচেন। তাদের এই হিসাব অনুযায়ী, আরও একজনের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
তবে ওসি আতিকুর রহমানের দাবি, প্রাথমিক তদন্ত ও গ্রেপ্তার সহকারী ব্যবস্থাপকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগুনের সময় আটটি কক্ষে ১৯ জন অতিথি ছিলেন। তাদের মধ্যে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সাতজন আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং দুজন লাফ দিয়ে রক্ষা পেয়েছেন। এই ১৯ জনের বাইরে আর কেউ নিখোঁজ রয়েছেন, এমন তথ্য তদন্তে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে লিখিত দাবিও করা হয়নি।
জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেছেন, ১০টি মরদেহ উদ্ধারের পর আরও একজন নিখোঁজ থাকার বিষয়টি সামনে আসে। পরে ফায়ার সার্ভিস আবার তল্লাশি চালালেও কোনো মরদেহ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলামের মতে, টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ড তাই কেবল একটি প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগার ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসার অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা তদারকি, মালিকদের দায় নির্ধারণ এবং তদন্তের স্বচ্ছতার প্রশ্ন।
তার ভাষ্য, আগুনের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, নিখোঁজের হিসাবের অসংগতি দূর করা এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার মধ্য দিয়েই এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে। ১০ পর্যটকের প্রাণহানির ঘটনায় সেই জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।





