রশি টেনে নদী পার
- ৪০ বছরেও সেতু হয়নি গুরুদাসপুরের গুমানী নদীতে

গুমানী নদী পার হতে এখনো ভরসা রশি আর খেয়ানৌকা। ছবি: আগামীর সময়
নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার গুমানী নদী পার হতে এখনো ভরসা একটি রশি আর একটি খেয়ানৌকা। নদীর এক পাড় থেকে আরেক পাড়ে যেতে নৌকায় ওঠার পর যাত্রীদের নিজের হাতেই রশি টেনে নৌকাটি এগিয়ে নিতে হয়। এ দৃশ্য যেন কয়েক দশক আগের বাংলাদেশের। অথচ স্বাধীনতার অর্ধশতক পেরিয়ে গেলেও এখানকার মানুষের ভাগ্যে জোটেনি একটি সেতু।
স্থানীয়দের ভাষ্য, চার দশক ধরে গুমানী নদীর ওপর একটি সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। কিন্তু এখনো কাগজেই আটকে রয়েছে সে দাবি। ফলে প্রতিদিন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক, রোগী, চাকরিজীবীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হচ্ছেন রশি টেনে। বর্ষা এলে আরও বেড়ে যায় দুর্ভোগ।
চলনবিলের বুক চিরে বয়ে যাওয়া গুমানী নদীর কাছিকাটা দাসপাড়া নিশিবাড়ী ঘাট থেকে বিলব্যাসপুর পর্যন্ত অংশটি তিন উপজেলার সাতটি গ্রামের মানুষের প্রধান যোগাযোগের পথ। তাড়াশ উপজেলার থল নলডাঙ্গা ও হামকুড়া, চাটমোহর উপজেলার এনায়েতপুর এবং গুরুদাসপুর উপজেলার বিলব্যাসপুর, বিলকাঠুর, রানীগ্রাম ও ইয়াসিনপুর গ্রামের হাজারো মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে প্রতিদিন এ ঘাট ব্যবহার করেন।
স্থানীয়দের অর্থায়নে মাসিক ৯ হাজার টাকা পারিশ্রমিকে মাঝি ময়লাল খেয়ানৌকা চালান সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। কিন্তু বর্ষায় নদীর পানি ও স্রোত বেড়ে গেলে সেই পারাপার হয়ে ওঠে ভয়ংকর। অনেক সময় দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া যায় না অসুস্থ রোগীকে। পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে দুশ্চিন্তায় থাকে শিক্ষার্থীরা। কৃষকের উৎপাদিত ফসল সময়মতো বাজারে নিতে না পেরে পড়তে হয় লোকসানের মুখে।
স্থানীয় বাসিন্দা আসলাম আলীর ভাষ্য, ‘একটা সেতুর জন্য কত বছর ধরে অপেক্ষা করছি, তার হিসেব নেই। সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় লাগে। কোনো রোগী অসুস্থ হলে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হয় নদী পার হওয়া নিয়ে। একটি সেতু হলে আমাদের জীবনটাই বদলে যেত।’
স্থানীয় দবীর উদ্দিনের দাবি, ‘ভোটের আগে অনেক প্রতিশ্রুতি শুনি। কিন্তু ভোট শেষ হলে সেতুর কথাও শেষ হয়ে যায়। আমরা শুধু একটি নিরাপদ চলাচলের পথ চাই।’
বিলব্যাসপুর গ্রামের সালাম সরকার বলেছেন, ‘গুমানী নদী আমাদের জন্য আশীর্বাদও, আবার অভিশাপও। নদী আছে; কিন্তু সেতু নেই। ফলে উন্নয়নের মূল স্রোত থেকে আমরা পিছিয়ে আছি। একটি সেতু হলে তিন উপজেলার মানুষের যোগাযোগ সহজ হবে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিতেও নতুন সম্ভাবনা দেখা দেবে।’
মশিন্দা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আব্দুল বারী জানালেন, বিলব্যাসপুর ও রানীগ্রাম মৌজার মধ্যবর্তী আত্রাই নদের ওপর রাবারড্যাম নির্মাণ প্রকল্প বর্তমানে একনেকের অনুমোদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। অনুমোদন মিললে প্রকল্পের কাজ শুরু হবে বলে আশা করছেন তিনি।
উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী সাইদুর রহমানের আশ্বাস, ‘এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জানা আছে। সেখানে সেতুর পাশাপাশি একটি রাবারড্যাম নির্মাণ করা হলে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচসুবিধাও নিশ্চিত হবে। প্রকল্পটি বর্তমানে একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে অনুমোদন পাওয়া গেলে নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হতে পারে।’
এ বিষয়ে গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজের বক্তব্য জানতে কয়েকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।




