‘দুঃখ’ তকমা ঘুচবে কি ভবদহের
খননে জেগেছে আশা
- ১৯৮৮ সাল থেকে স্থায়ীভাবে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা
- কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয় হলেও মেলেনি স্থায়ী সমাধান
- নতুন প্রকল্পের আওতায় খনন করা হচ্ছে ছয়টি নদ-নদী

বর্ষা এলেই আতঙ্ক নেমে আসে ভবদহ অঞ্চলে। ঘরবাড়ি, ফসলের মাঠ, রাস্তা— সবকিছু পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার স্মৃতি এখানকার মানুষের কাছে নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে জলাবদ্ধতার সঙ্গে বাস করতে করতে অনেকেই একে ‘ভবদহের অভিশাপ’ বলেই অভিহিত করেন।
জলাবদ্ধতা নিরসনে চার দশকে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের পরও স্থায়ী সমাধান মেলেনি। তবে এবার নতুন করে আশার আলো দেখছেন ভবদহ পাড়ের মানুষ। কারণ, জলাবদ্ধতা নিরসনে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ছয় নদী পুনঃখনন শুরু করেছে সরকার।
কেন তৈরি হলো ভবদহের সংকট: যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে ভবদহ অঞ্চল। মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদ-নদী দিয়ে ওঠানামা করে এ অঞ্চলের পানি। ১৯৬১ সালে অভয়নগর উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের ভবদহ এলাকায় নির্মাণ করা হয় স্লুইসগেট। ১৯৮৮ সাল থেকে স্থায়ীভাবে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। এর মূল কারণ ভবদহের ভাটিতে থাকা নদ-নদীগুলোর নাব্য হারানো। স্থানীয়দের মতে, একসময় এ অঞ্চলের নদ-নদীগুলো স্বাভাবিকভাবে বহন করত জোয়ার-ভাটার পানি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নদীগুলোর তলদেশে পলি জমে নাব্য কমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু নদী ভরাট হওয়াই নয়, খালগুলোর অকার্যকারিতা, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত বাঁধ এবং জলপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হওয়াও জটিল করেছে সমস্যাটি।
ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইডিইবি) সাবেক সভাপতি খায়রুল উমামের ভাষায়, ‘১৯৮৮ সাল থেকেই ভবদহ অঞ্চলের বিলগুলোয় স্পষ্ট হতে শুরু করে স্থায়ী জলাবদ্ধতার চিত্র। এরপর থেকে ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে সমস্যাটি।’
সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নতুন প্রকল্প: সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে ২০২৫ সালের অক্টোবরে। লক্ষ্য হচ্ছে ২০২৬ সালের জুন-জুলাইয়ের মধ্যে কাজটি শেষ করা। প্রকল্পের আওতায় পুনঃখনন করা হচ্ছে হরিহর, হরি-তেলিগাতি, আপার ভদ্রা, টেকা ও শ্রী নদীসহ ভবদহ অঞ্চলের ছয়টি নদ-নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার অংশ। যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের ৫৪ শতাংশের বেশি কাজ শেষ হয়েছে। পাশাপাশি খনন করা হয়েছে ভবদহ অঞ্চলের অভ্যন্তরে ২৫টি খালও।
শুধু নদী খনন কি যথেষ্ট: এখানেই মতপার্থক্য রয়েছে বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীদের মধ্যে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা মনে করছেন, নদী পুনঃখনন, খাল পরিষ্কার, স্লুইসগেট সচল এবং নতুন পাম্প স্থাপনের মাধ্যমে এবারের বর্ষায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কমে আসবে উল্লেখযোগ্যভাবে।
তবে পরিবেশবাদী সংগঠন বেলার বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেছেন, ‘নদী খনন গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি একমাত্র সমাধান নয়।’ তার মতে, নদীর ওপর নির্মিত ক্রস বাঁধগুলো বাধা সৃষ্টি করছে পানি প্রবাহে। পাশাপাশি টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) বা জোয়ারাধার পদ্ধতি চালু না করলে দীর্ঘমেয়াদে পলি ব্যবস্থাপনা সম্ভব হবে না। আমডাঙ্গা খাল সংস্কার, ক্রস বাঁধ অপসারণ এবং নিয়মিত ড্রেজিং অব্যাহত রাখার দাবিও জানান তিনি।
মানুষের প্রত্যাশা: ভবদহ অঞ্চলের মানুষের কাছে এ প্রকল্প শুধু একটি উন্নয়ন কর্মসূচি নয়; এটি দীর্ঘ দুর্ভোগ থেকে মুক্তির সম্ভাবনা। কৃষকরা আশা করছেন, বছরের পর বছর পানির নিচে থাকা জমিগুলো আবারও হবে চাষের উপযোগী। শিক্ষার্থীরা চান বর্ষায় বিদ্যালয়ে যাতায়াতের কষ্ট কমুক। ব্যবসায়ীরা চান স্বাভাবিক যোগাযোগব্যবস্থা ফিরে আসুক।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেছেন, ‘বর্ষার আগেই ক্রস বাঁধ অপসারণ এবং নদীতে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।’ তার বিশ্বাস, এতে নতুন করে পানি জমার আশঙ্কা অনেকটাই কমবে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ভবদহের স্থায়ী সমাধানকে সরকারের অন্যতম রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন।




