খবরের ফেরিওয়ালাদের ছুটি নেই, আছে টিকে থাকার লড়াই

অন্যদের অধিকার আদায়ের খবর বিলি করলেও তারা নিজেরা ন্যূনতম মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।
সকাল থেকে বিকেল–রোদ হোক বা বৃষ্টি, শীত কিংবা তীব্র গরম; কোনো কিছুই থামায় না তাদের। ভোর হতেই হকাররা ছুটে যান পত্রিকা বিক্রির এজেন্টের কাছে। সেখান থেকে দৈনিক পত্রিকা সংগ্রহ করে আবার দৌড় শুরু হয় গ্রাহকের দুয়ারে দুয়ারে।
দেশ, সমাজ আর বিশ্বজুড়ে কী ঘটছে, সেই খবর মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই যেন তাদের ব্রত। কাগজের সম্পাদক আর পাঠকের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি করা এই মানুষগুলোর পরিচয় সমাজে কেবলই ‘হকার’ নামে। অথচ সবার খবর মানুষের কাছে পৌঁছে দিলেও এই হকারদের খবর রাখার ফুরসত যেন কারও নেই।
আজ আন্তর্জাতিক মহান মে দিবস ও শ্রমিক সুরক্ষা দিবস। সারা বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষ যখন তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ে রাজপথে মিছিল-সমাবেশ করছে, সংবাদপত্র বিক্রির এই কারিগরদের তখন দম ফেলার সময় নেই।
স্থানীয়, জাতীয় কিম্বা আন্তর্জাতিক সব খবর গ্রাহকের হাতে পৌঁছে দিতে তারা আজও পত্রিকা নিয়ে ছুটছেন এ গলি থেকে ও গলি। অন্যদের অধিকার আদায়ের খবর বিলি করলেও তারা নিজেরা ন্যূনতম মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। এভাবে প্রতিনিয়ত টিকের থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন হকাররা।
বেশ কয়েকজন হকারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল তাদের জীবনযুদ্ধের করুণ গল্প। হকার আলতাফ হোসেন জানান, প্রতিদিন ২৫০-৩০০ টাকা আয় হয়, যা দিয়ে বর্তমান সময়ে একজন মানুষের চলাই মুশকিল। পরিবারের আবাসন, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
আলতাফ হোসেন বাধ্য হয়ে নিজের ছেলেকেও এই পেশায় নামিয়েছেন। বাবা-ছেলের সামান্য আয়ে কোনোমতে টিকে আছে পরিবারটি। আলতাফ বলেছেন, ‘জীবন বাজি রেখে কাগজ পৌঁছে দিই, কিন্তু দুর্ঘটনায় কেউ পাশে দাঁড়ায় না। হাজারে মাত্র ১০০ টাকা লাভে সংসার চলে না, তাই বাধ্য হয়ে অন্য ব্যবসা করতে হয়’।
পত্রিকা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো খোঁজখবর নেওয়া হয় কি না জানতে চাইলে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি জানান, প্রতিবছর রমজানের ঈদের আগে মাত্র একদিন সব পত্রিকা ফ্রি দেয়। বছরের ওই একটি দিনই আমাদের প্রাপ্তি। আজকাল কেউ কারো খবর রাখে না, সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত।
পত্রিকার এজেন্সি মালিক ও হকার্স সমিতির সভাপতি আলমগীর হোসেনের জানান, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে কাগজের পত্রিকার চাহিদা আগের মতো নেই। পত্রিকা বিক্রির হার প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে।
‘আগে মালিকরা হকারদের খোঁজখবর রাখতেন, যা এখন আর দেখা যায় না’, আক্ষেপ করেন আলমগীর হোসেন।
স্থানীয় পর্যায়ে সম্পাদক ও সাংবাদিকদের নিয়ে উপদেষ্টা কমিটি থাকলেও সেখান থেকে আসা সহায়তা অতি সামান্য। আলমগীর হোসেন জানান, কোনো হকার অসুস্থ বা সমস্যায় পড়লে তারা সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করেন, কিন্তু কোনো স্থায়ী তহবিল না থাকায় আর্থিকভাবে বড় কোনো সহযোগিতা করা সম্ভব হয় না।



