আজ ‘কৃষ্ণপুর গণহত্যা দিবস’, একসঙ্গে হত্যা করা হয় ১২৭ জনকে

সংগৃহীত ছবি
আজ ১৮ সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার কৃষ্ণপুর গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে সনাতন ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত কৃষ্ণপুর গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা হত্যাযজ্ঞ চালায়। এতে ৫০ জন নিহত হন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় হবিগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ড হিসেবে পরিচিত এ ঘটনায় ভোরে পাকিস্তানি সেনারা লাখাই, নাসিরনগর ও অষ্টগ্রাম থানার রাজাকারদের সহযোগিতায় গুলি চালিয়ে একসঙ্গে ১২৭ জন বাঙালি হিন্দুকে হত্যা করে। পরে তাদের লাশ পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
তখন কৃষ্ণপুর ছিল বৃহত্তর সিলেট জেলার একটি প্রত্যন্ত হাওরগ্রাম। বর্তমানে এটি লাখাই উপজেলার দক্ষিণে, থানা থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে। গ্রামের দক্ষিণে বলভদ্র নদী। এর ওপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার হিন্দু অধ্যুষিত চণ্ডীপুর গ্রাম।
মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ছয় মাস কৃষ্ণপুরের মানুষ অনেকটা স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন। যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হওয়ায় আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের বহু সনাতন ধর্মাবলম্বী সেখানে আশ্রয় নেন। তাদের ধারণা ছিল, হাওরের প্রত্যন্ত এই গ্রামে পাকিস্তানি সেনারা আসবে না।
লাখাইয়ে পাকিস্তানি সেনাদের প্রথম ক্যাম্প ছিল মানপুরে। পরে স্বজনগ্রামের টাউনশিপে ক্যাম্প করা হয়। মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ ও যোগাযোগের অসুবিধায় পরে তারা লাখাই ছেড়ে অষ্টগ্রামে চলে যায়।
স্থানীয় প্রবীণ ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ সেপ্টেম্বর রাজাকাররা কৃষ্ণপুরে গণহত্যার পরিকল্পনা করতে অষ্টগ্রামের পাকিস্তানি ক্যাম্পে জড়ো হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে তারা নৌকা, স্পিডবোট ও লঞ্চ নিয়ে গ্রামটি ঘিরে ফেলে।
১৮ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা থেকে ৫টার দিকে অষ্টগ্রাম সেনাক্যাম্প থেকে একটি স্পিডবোট ও ১০ থেকে ১২টি বড় নৌকায় পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল কৃষ্ণপুরে আসে। তাদের সঙ্গে ছিল লাখাইয়ের মুরাকরি গ্রামের খেলু মিয়া, লিয়াকত আলী ও বাদশা মিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ফান্দাউকের আহাদ মিয়া ও বল্টু মিয়া, অষ্টগ্রামের লাল খাঁ, আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব আলী এবং লাখাইয়ের সস্তোষপুরের মোর্শেদ কামাল ওরফে শিশু মিয়াসহ ৪০ থেকে ৫০ জন রাজাকার-আলবদর।
গ্রামে ঢুকেই পাকিস্তানি সেনারা নির্বিচারে গুলি চালায়। রাজাকাররা বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করে। পরে গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় কমলাময়ী উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে ১৩১ জন হিন্দুকে চক্রাকারে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করলে ১২৭ জন নিহত হন। প্রিয়তোষ রায়, নবদ্বীপ রায় ও হরিদাস রায় গুলিবিদ্ধ হয়েও বেঁচে যান। তাদের মধ্যে হরিদাস রায় এখনো সেই স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন।
এ ছাড়া লালচাঁদপুরে মধু নমঃশূদ্রের বাড়িতে ৫১ জনকে এবং গোকুলনগরে আটজন হিন্দুকে একই কায়দায় হত্যা করা হয়। তিন স্থানে মোট ১৮৬ জন নিহত হন।
২০১০ সালের ৪ মার্চ হরিদাস রায় রাজাকার লিয়াকত আলীসহ অন্যদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। হত্যার হুমকি পেয়ে ৭ জুন লাখাই থানায় জিডি করেন তিনি। ১২ আগস্ট কৃষ্ণপুর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গৃহীত হয়।
লিয়াকত আলী ও রজব আলীর বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, আটক, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্ষণ ও লুটপাটের সাতটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। লিয়াকত আলী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এবং রজব আলী পাকিস্তানে অবস্থান করছেন।



