আসছে শীত, খেজুরগাছ পরিচর্যায় ব্যস্ত যশোরের গাছিরা

রস সংগ্রহের উপযোগী করে তুলতে খেজুর গাছের ডালপালা পরিষ্কার করা হয়েছে। ছবি: আগামীর সময়
শীত পুরোপুরি না এলেও যশোরে শুরু হয়েছে খেজুরগাছ পরিচর্যার ব্যস্ততা। রস সংগ্রহের উপযোগী করে তুলতে কেউ গাছের ডালপালা পরিষ্কার করছেন, কেউ ছেঁটে প্রস্তুত করছেন গাছের মাথা। কয়েক দিনের মধ্যেই গাছে গাছে ঝুলবে মাটির হাঁড়ি। ভোরের আলো ফোটার আগে সেই হাঁড়িতে জমবে খেজুরের মিষ্টি রস। পরে চুলায় জ্বাল দিয়ে তৈরি হবে সুস্বাদু গুড় ও পাটালি। শীতকে ঘিরে জেলার বিভিন্ন গ্রামে এখন চলছে সেই প্রস্তুতি।
খেজুরের রস ও গুড়কে কেন্দ্র করে যশোরের গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রতি বছরই তৈরি হয় বাড়তি কর্মচাঞ্চল্য। তবে দক্ষ গাছির সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ন্যায্য দাম না পাওয়া এবং বাজারে ভেজাল গুড়ের দাপটে চাপে আছেন উৎপাদনকারীরা।
চৌগাছার গাছি আব্দুল আলিমের কাছেও শীত শুধু ঋতু পরিবর্তনের সময় নয়, বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়ের মৌসুম। গত বছর ১১৭টি খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় ও পাটালি তৈরি করেছিলেন তিনি। মান ভালো হওয়ায় ক্রেতাদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন আগাম অর্ডারও। পুরো মৌসুমে প্রায় ৯০ হাজার টাকার গুড়-পাটালি বিক্রি করেন। এবারও ভালো আয়ের আশায় গাছ প্রস্তুত করছেন তিনি।
যশোরের খেজুরের রস ও গুড়ের ঐতিহ্য বহুদিনের। ‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’ প্রবাদটি সেই ঐতিহ্যেরই পরিচয় বহন করে। স্বাদ ও মানের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ জেলার গুড়ের চাহিদা আছে। সম্প্রতি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ায় শিল্পটির সম্ভাবনা আরও বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশা, পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে দেশের বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও যশোরের খেজুরের গুড়ের বাজার সম্প্রসারণ সম্ভব হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যশোরে রস আহরণের উপযোগী খেজুরগাছ রয়েছে ৩ লাখ ১২ হাজার ৯৬১টি। চলতি মৌসুমে এসব গাছ থেকে ৩ কোটি ৮৮ লাখ ৬ হাজার ৫৬৫ লিটার রস সংগ্রহ এবং ৩ হাজার ৯০ মেট্রিক টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদনকে ঘিরে শীতের কয়েক মাস গ্রামাঞ্চলে নানা পেশার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়। গাছিদের পাশাপাশি মাটির হাঁড়ি তৈরির কারিগর, জ্বালানি সরবরাহকারী, ব্যবসায়ী ও পরিবহনশ্রমিকরাও এ সময় বাড়তি আয় করেন। উৎপাদিত গুড়ের বড় অংশ স্থানীয় হাটবাজারের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। শীতকালে পিঠাপুলি, পায়েস ও মিষ্টি তৈরিতে গুড়ের চাহিদা বাড়ে। পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার প্রসারে অনেক উদ্যোক্তা সরাসরি ক্রেতাদের কাছে গুড় ও পাটালি পৌঁছে দিচ্ছেন। এতে উৎপাদকদের সামনে নতুন বাজার তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
তবে এ শিল্পের অন্যতম বড় সংকট দক্ষ গাছির অভাব। চৌগাছা উপজেলার চাকলা গ্রামের আবদুল কুদ্দুস বংশপরম্পরায় এ পেশা ধরে রেখেছেন। পূর্বপুরুষের পেশা এখনো চালিয়ে গেলেও নতুন প্রজন্মের মধ্যে এ কাজের প্রতি আগ্রহ কমছে বলে জানালেন তিনি।
স্থানীয় গাছিরা জানান, খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ বেশ পরিশ্রমের কাজ। শীতের কনকনে ভোরে গাছে ওঠা, নিয়মিত গাছ পরিষ্কার করা, হাঁড়ি বসানো, রস নামানো এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুলায় জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করতে হয়। অথচ এ কাজ থেকে আয় আসে বছরের নির্দিষ্ট কয়েক মাস। ফলে তরুণদের অনেকে বিকল্প পেশার দিকে ঝুঁকছেন। বয়সের কারণে প্রবীণ গাছিরা কাজ ছেড়ে দিলে তাদের জায়গায় দক্ষ জনবল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
উৎপাদন ব্যয় ও বাজারমূল্যের ব্যবধানও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। জেলার অন্যতম বাণিজ্যিক খেজুর বাগানের মালিক আল মামুনের মতে, খাঁটি গুড় উৎপাদনকারীদের জন্য কম দামের নিম্নমানের ও ভেজাল গুড় বড় প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে।
আল মামুন বলেছেন, এক কেজি খাঁটি গুড় তৈরি করতে প্রায় ১০ লিটার খেজুরের রস প্রয়োজন হয়। এর সঙ্গে গাছ পরিচর্যা, রস সংগ্রহ, শ্রমিক ও জ্বালানির খরচ যোগ হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। গত মৌসুমে তিনি সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা কেজি দরে গুড় বিক্রি করেছেন। অথচ বাজারে ২৫০ টাকা কেজি দরেও গুড় পাওয়া যায়।
তিনি বললেন, দামের এত বড় পার্থক্যের বিষয়ে ক্রেতাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। কম দামে বিক্রি হওয়া সব গুড়ের মান ও উপাদান এক নয়। তাই গুড় কেনার আগে এর বিশুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। বাজারে ভেজাল গুড়ের উপস্থিতি খাঁটি গুড় উৎপাদনকারীদের ন্যায্য দাম পাওয়ার পথেও বাধা সৃষ্টি করছে।
এ শিল্পের বিকাশে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আল মামুন। তার মতে, বাণিজ্যিকভাবে খেজুর বাগান সম্প্রসারণ, প্রদর্শনী প্লট স্থাপন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি খেজুরের গুড় রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, যশোরের খেজুরের গুড়ের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও আছে। জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ায় সেই সম্ভাবনা আরও বেড়েছে। নিরাপদ উপায়ে রস সংগ্রহ ও মানসম্মত গুড় উৎপাদনে গাছিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণ ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমেও তাদের সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত গাছিদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়নি।




