অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলে নাজেহাল গ্রাহক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রায় একই; কিন্তু মাস শেষে বিলের অঙ্ক দ্বিগুণ, কোথাও তিন গুণ। এমনকি দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের মধ্যেও অস্বাভাবিক বিল হাতে পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অনেক গ্রাহক। বরগুনার বেতাগী ও দিনাজপুরের হিলিতে পল্লী বিদ্যুতের বিল নিয়ে এমন অভিযোগই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। গ্রাহকদের অভিযোগ, প্রকৃত মিটার রিডিংয়ের বদলে অনেক ক্ষেত্রে তৈরি করা হচ্ছে অনুমাননির্ভর বিল। এমন বিলে নাজেহাল তারা। যদিও পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বলছে, অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে নেওয়া হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
অবশ্য বিদ্যুৎ বিল নিয়ে এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। চলতি মাসে দুই অঞ্চলের গ্রাহকদের ভোগান্তি একই হওয়ায় বিষয়টি আলোচনায় এসেছে নতুন করে। বরগুনার বেতাগীতে চলতি মাসে বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকরা অতিরিক্ত ও অসংগতিপূর্ণ বিদ্যুৎ বিল পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
তাদের দাবি, দীর্ঘ সময় লোডশেডিং থাকার পরও হঠাৎ করেই বিল বেড়ে গেছে অস্বাভাবিকভাবে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিয়মিত প্রতিবাদ জানাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।
স্থানীয় গ্রাহক জসিম উদ্দীনের বিদ্যুৎ-সংযোগে আগের মিটার রিডিং ছিল ১৮৫ ইউনিট; কিন্তু চলতি মাসের বিলে তা দেখানো হয়েছে ৪৪০ ইউনিট। অথচ গত মাসে তার বিল ছিল ১ হাজার ৪০০ টাকা। এবার এসেছে ৩ হাজার ৯৪৬ টাকা। এ বিল কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে তিনি পড়েছেন দুশ্চিন্তায়।
বেতাগী বন্দরের ব্যবসায়ী রুবেল মল্লিকের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে মিটার দেখে রিডিং নেওয়ার পরিবর্তে অফিসে বসেই তৈরি করা হচ্ছে অনুমাননির্ভর বিল। ফলে স্বাভাবিক ব্যবহারের তুলনায় দ্বিগুণ-তিন গুণ বিল গুনতে হচ্ছে গ্রাহকদের।
শুধু আর্থিক চাপ নয়, এতে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাও কমছে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। কার্যকর তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
যদিও অভিযোগের বিষয়ে বেতাগী সাব-জোনাল অফিসের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. মুনতাসির বিন হাসিবের ভাষ্য, বিদ্যুৎ ব্যবহার বেশি হওয়া বা মিটার রিডিংয়ে কোনো ভুল থাকলে অভিযোগ যাচাই করে দ্রুত সমন্বয় করা হবে বিদ্যুৎ বিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহ. সাদ্দাম হোসেনেরও নজরে এসেছে। অনুমানভিত্তিক বিল গ্রহণযোগ্য নয় উল্লেখ করে তিনি বললেন, ‘বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে নেওয়া হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।’
বেতাগীর মতোই প্রায় একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে দিনাজপুরের হিলিতেও। সেখানে শুধু অভিযোগই নয়, অতিরিক্ত বিল নিয়ে সরাসরি সাব-জোনাল অফিসে নিয়মিত ভিড় করছেন অসংখ্য গ্রাহক। গত সোমবার বিল পরিশোধের দিন হিলি পল্লী বিদ্যুতের সাব-জোনাল অফিসে গিয়ে দেখা গেছে, বিল জমা দেওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ জানাতেও সহকারী মহাব্যবস্থাপকের কার্যালয়ের সামনে ভিড় করেছেন অসংখ্য গ্রাহক। অনেকের হাতেই ছিল আগের ও চলতি মাসের বিল। তাদের প্রশ্ন, ব্যবহার প্রায় একই থাকলেও বিল এত বেড়ে গেল কীভাবে?
খট্টা ইউনিয়নের বাসিন্দা বিপ্লব হোসেনের ভাষায়, দুই মাস আগেও তার বিদ্যুৎ বিল ছিল ২০০০-২২০০ টাকার মধ্যে। গত মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭০০ টাকায়। আর চলতি মাসে বিল এসেছে ৭ হাজার টাকার বেশি।
একই অভিযোগ হিলি বাজারের ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান, পলাশ ও আপেলসহ কয়েকজন ব্যবসায়ীর। তাদের দাবি, দোকানের বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রায় একই থাকলেও কয়েক মাসের ব্যবধানে দ্বিগুণের বেশি হয়ে গেছে বিল। এতে কঠিন হয়ে পড়ছে ব্যবসা পরিচালনা করা। গ্রাহকদের অভিযোগের সঙ্গে স্থানীয়দের পর্যবেক্ষণও মিলছে। তাদের মতে, সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের না করলে এমন ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে।
স্থানীয় আইনজীবী কবির উদ্দিনের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই অনেক মিটারের রিডিং নির্ধারিত সময়ে নেওয়া হয় না। ফলে একাধিক মাসের ইউনিট একসঙ্গে যুক্ত হয়ে অতিরিক্ত বিল আসে। নিয়মিত মিটার রিডিং এবং বিলিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে, এ ধরনের সমস্যা কমে আসবে অনেকটাই।
চলতি বছরের জুনে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বা প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আর গ্রাহক পর্যায়ে বাড়ানো হয়েছে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বা ১ টাকা ৫২ পয়সা। এ ছাড়া সঞ্চালন চার্জ বেড়েছে ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ। নতুন এ দাম কার্যকর হয়েছে জুন থেকেই।
হিলি সাব-জোনাল অফিসের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সোহরাওয়ার্দী জানিয়েছেন, আগের তুলনায় লোডশেডিং কম থাকায় বেড়েছে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ। পাশাপাশি বেড়েছে ইউনিটের দামও। এ দুটি কারণেই অনেকের বিল বেশি এসেছে। তবে কোনো গ্রাহকের মিটার রিডিং বা বিলে অসংগতির অভিযোগ থাকলে তা যাচাই করে নেওয়া হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
কিন্তু এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন অধিকাংশ গ্রাহক। তাদের দাবি, প্রকৃত ব্যবহার না বাড়লেও কেন বিল অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি মিটারের নিয়মিত রিডিং গ্রহণ, বিল প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।






