সড়ক ‘তুমি পথ হারাইয়াছ?’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঝোপঝাড়, লতাগুল্ম আর ঘন জঙ্গলে ঢাকা পড়েছে পুরো সড়ক। কোথাও পিচ উঠে গেছে, কোথাও সরে গেছে ইট-সুরকি। তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। চারপাশে নীরবতা। মাঝেমধ্যে ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে শিয়াল কিংবা সাপ। দেখে বোঝার উপায় নেই, একসময় এ পথ দিয়েই চলাচল করত রিকশা-ভ্যান, সাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। অথচ সেটিই ছিল বিল এলাকার মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান পথ।
পাবনার বেড়া উপজেলার বড়শিলা-নলভাঙা-খাকছাড়া সড়কের এখন এমনই অবস্থা। প্রায় ১৩ বছর আগে নির্মিত পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চলাচলের অনুপযোগী। এতে বেড়া উপজেলার দুটি ইউনিয়নের অন্তত ১০টি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষকে প্রতিদিন পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ। অথচ নির্মাণের পর সড়কটি ওই এলাকার মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এনেছিল।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তথ্য বলছে, বিল এলাকার কৃষিপণ্য পরিবহন এবং বাসিন্দাদের উপজেলা সদরে যাতায়াত সহজ করতে ২০১৩ সালে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। বেড়া পৌরসভার বড়শিলা থেকে চাকলা ইউনিয়নের নলভাঙা হয়ে খাকছাড়া পর্যন্ত সড়কটি বিলের মধ্য দিয়ে গেছে।
সড়ক চালুর পর বদলে গিয়েছিল যোগাযোগব্যবস্থা। চাকলা ও কৈতোলা ইউনিয়নের খাকছাড়া, নলভাঙা, চাকলা, দমদমা, জয়নগর, কৈতোলা, বড়শিলাসহ আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষ এর সুফল পেতে শুরু করেন। বিল এলাকায় উৎপাদিত ধান, পাট ও শাকসবজি দ্রুত ও কম খরচে উপজেলা সদরের বাজারে নেওয়া যেত। মূল মহাসড়ক এড়িয়ে এই আঞ্চলিক সড়ক ব্যবহার করায় কমেছিল যাতায়াতের সময় ও খরচ।
কিন্তু নির্মাণের সময় বিল এলাকার ভৌগোলিক বাস্তবতা যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। সড়কটি অপেক্ষাকৃত নিচু ও সরু হওয়ায় বর্ষাকালে বিলের পানির চাপ ও অতিবৃষ্টিতে নির্মাণের প্রথম বছর থেকেই বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। প্রথম ছয়-সাত বছর খানাখন্দ পেরিয়ে কোনোভাবে যানবাহন চলাচল করলেও পরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। নিয়মিত সংস্কার না হওয়ায় ধীরে ধীরে সড়কটি মানুষের চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
নলভাঙা গ্রামের মো. হোসেন আলীর ক্ষোভ যেন এই দুর্ভোগেরই প্রতিচ্ছবি। তিনি বলেছেন, ‘একসময় এই রাস্তা দিয়ে সহজেই বাজারে যাওয়া যেত। ধান ও সবজি নিয়ে হাটে যেতাম। এখন দিনের বেলায়ও এই পথে হাঁটতে ভয় লাগে। সাপ-শিয়ালের উপদ্রব বেড়েছে। তিন কিলোমিটারের পথ এড়িয়ে এখন ৮-১০ কিলোমিটার ঘুরে উপজেলা সদরে যেতে হয়। এতে যাতায়াত খরচও হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ।’
সড়কটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব শুধু যাতায়াতেই সীমাবদ্ধ নেই। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন কৃষকরা। উৎপাদিত ধান, পাট ও সবজি বাজারে নিতে এখন বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হয়। এতে পরিবহন খরচ বেড়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে কৃষকরা তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হন। একইভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আনা-নেওয়ার খরচ বাড়ায় চাপ পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট।
এলজিইডি কর্তৃপক্ষ বলছে, সড়কটি পুনর্নির্মাণ ও মানোন্নয়নের জন্য ২০২২ সালে প্রায় ১০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করে পাঠানো হয়েছিল মন্ত্রণালয়ে। এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এলাকাটি পরিদর্শনও করেন। তবে অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি অনুমোদন পায়নি।
তবে আশার কথা জানিয়েছেন পাবনা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম। তার ভাষ্য, নলভাঙা-বড়শিলা সড়কটি ওই এলাকার মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে পাঠানো একটি প্রকল্প অনুমোদন না পাওয়ায় কাজটি আটকে যায়। সম্প্রতি সরকার ‘পাবনা প্রকল্প’ নামে একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর আওতায় সড়কটি বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।





