দেশের ২৪৮ শকুনের ১১০টি এক জেলাতে
- ১২ বছরে শকুনের সংখ্যা ৭৮ থেকে বেড়ে ১১০
- খাবারের ‘রেস্তোরাঁয়’ মিলছে নিরাপদ আশ্রয়
- রেমার মডেল অনুসরণ করছে ভারত-নেপাল

দেশের আকাশ থেকে যখন হারিয়ে যেতে বসেছে একসময়ের অতিপরিচিত শকুন, তখন উল্টো চিত্র দেখা গেছে হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বনে। দীর্ঘদিনের সংরক্ষণ উদ্যোগে এই বনাঞ্চলে শুধু শকুনের সংখ্যা বাড়েনি; বেড়েছে তাদের প্রজনন সফলতাও। ২০১৪ সালে যেখানে রেমা-কালেঙ্গায় শকুনের সংখ্যা ছিল ৭৮টি, সর্বশেষ শুমারিতে সেখানে অস্তিত্ব পাওয়া গেছে ১১০টি বাংলা শকুনের।
শকুন পরিবেশ-প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু। মৃত প্রাণীর দেহ খেয়ে রোগজীবাণুর বিস্তার ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এই পাখি। কিন্তু খাদ্যসংকট, আবাসস্থল ধ্বংস, গাছ কাটা এবং গবাদি পশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ক্ষতিকর ব্যথানাশক ওষুধের কারণে দক্ষিণ এশিয়া জুড়েই ভয়াবহভাবে কমেছে শকুনের সংখ্যা। বাংলাদেশেও পড়েছে এর প্রভাব।
১৯৭০ সালের শকুনশুমারি অনুযায়ী, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ছিল প্রায় ৫০ হাজার শকুন। ২০০৮-০৯ সালের শুমারিতে বাংলাদেশে সে সংখ্যা নেমে আসে ১ হাজার ৯৭২টিতে। ২০১১-১২ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৮১৬টিতে। এমন পরিস্থিতিতে শকুন রক্ষায় ২০১৪ সাল থেকে যৌথভাবে কাজ শুরু করে বন বিভাগ ও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন)। ওই বছরের ২৩ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যকে ঘোষণা করা হয় শকুনের জন্য ‘নিরাপদ এলাকা’। একই উদ্যোগে সুন্দরবনকেও নির্ধারণ করা হয় শকুনের নিরাপদ এলাকা হিসেবে।
রেমা-কালেঙ্গায় গড়ে তোলা হয় শকুন সংরক্ষণ কেন্দ্র। সেখানে শকুনের জন্য তৈরি করা হয় নিরাপদে বিশ্রাম ও প্রজননের সুযোগ। পরে প্রজনন মৌসুমে খাবারের জোগান নিশ্চিত করতে স্থাপন করা হয় ফিডিং সেন্টার বা শকুনের ‘রেস্তোরাঁ’। ২০১৫ সালে রেমা-কালেঙ্গা ও সুন্দরবনে চালু করা হয় দুটি ফিডিং সেন্টার। এসব উদ্যোগের প্রভাব পড়েছে শকুন প্রজননেও। ২০১৪ সালের শুমারি অনুযায়ী, রেমা-কালেঙ্গায় শকুনের প্রজনন হার ছিল ৪৪ শতাংশ। ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ শতাংশে।
এরপর থেকে বাড়তে থাকে প্রজনন সফলতার হার। ২০২১-২২ মৌসুমে রেমা-কালেঙ্গায় ১৪টি শকুনের বাসার মধ্যে সফল প্রজনন হয় ১০টিতে। এতে প্রজনন সফলতার হার দাঁড়ায় ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ। পরের মৌসুমে, অর্থাৎ ২০২২-২৩ সালে ১৮টি বাসার মধ্যে ১৩টিতে সফলতা পাওয়া যায়। প্রজনন সফলতার হার বেড়ে হয় ৭২ দশমিক ২ শতাংশ, যা আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৮২ শতাংশ বেশি।
সবশেষ ২০২৩ সালের আইইউসিএনের শুমারিতে রেমা-কালেঙ্গায় অস্তিত্ব পাওয়া যায় ১১০টি বাংলা শকুনের। দেশে বর্তমানে প্রায় ২৪৮টি শকুন রয়েছে বলে উঠে এসেছে পরিসংখ্যানে। এসব শকুন মূলত রয়েছে সুন্দরবন ও সিলেট অঞ্চলে।
শকুন গবেষকরা বলছেন, গবাদি পশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ডাইক্লোফেনাক ও কিটোপ্রোফেনজাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ শকুন বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। এসব ওষুধ খাওয়া গবাদি পশুর মৃতদেহ শকুনের জন্য হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী। শকুন রক্ষায় বাংলাদেশে গরুর চিকিৎসায় কিটোপ্রোফেনজাতীয় ক্ষতিকর ওষুধের ব্যবহার করা হয়েছে নিষিদ্ধ।
বন বিভাগ ও আইইউসিএন পরিচালিত শকুন সংরক্ষণ প্রকল্পের মুখ্য বন্যপ্রাণী গবেষক সীমান্ত দীপু জানালেন, এক যুগের বেশি সময় ধরে শকুনের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এখন দেশে শকুনের সংখ্যা আর আগের মতো কমছে না, এটিকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন তিনি।
শকুন রক্ষায় তাদের সব কার্যক্রম চলমান আছে। সরকার দেশে গরুর ক্ষেত্রে কিটোপ্রোফেনজাতীয় ক্ষতিকর ওষুধের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে উল্লেখ করে সীমান্ত দীপুর ভাষ্য, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হয় শকুন সংরক্ষণ কার্যক্রম। এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত খাবার দেওয়ার কার্যক্রম বন্ধ থাকে, যাতে শকুন মানুষের দেওয়া খাবারের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে। সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রজনন মৌসুমে খাবার দেওয়া হয় তাদের।
রেমা-কালেঙ্গায় শকুনের জন্য তৈরি করা হয়েছে খাবারের ‘রেস্তোরাঁ’। সেখানে মাসে দুটি গরু জবাই করে খাবার দেওয়া হয় শকুনকে। নির্দিষ্ট সময়ে খাবার সরবরাহের পাশাপাশি তাদের চলাচল, খাবার গ্রহণ ও প্রজনন কার্যক্রমও পর্যবেক্ষণ করা হয়— যোগ করলেন তিনি। বলছিলেন, ‘২০১১ সাল থেকে আমরা শকুনের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করছি। এটা আমাদের বড় সফলতা। নেপাল ও ভারতও শকুন রক্ষায় আমাদের পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। আমাদের দেখাদেখি তারাও এ ধরনের কার্যক্রম চালাচ্ছে।’
শকুন নিয়ে কাজ করেন জেনিফার নামের একজন। জানালেন, রেমা বনাঞ্চলে শকুনের বংশবিস্তার নিয়ে কাজ করছেন তারা। যে হারে শকুনের সংখ্যা কমতে শুরু করেছিল, সেটি এখন থেমে গেছে।
ঢাকা বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ ইনাম আল হকের মতে, বাংলাদেশে প্রায় বিলুপ্তির পথে থাকা এ পাখিটির শেষ বড় আবাসস্থলগুলোর একটি হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা। এখানেই প্রজনন করছে তারা। শকুনের জন্য রেমা বনাঞ্চলের মতো নিরাপদ জায়গা বাংলাদেশে আর নেই।



