ফলনে হতাশা
- চাষের আগ্রহ কমছে কৃষকদের

যেখানে প্রতি বিঘায় ১৫-১৭ মণ পাট পাওয়ার আশা ছিল, সেখানে মিলছে মাত্র ৭-৮ মণ।
একসময় ‘সোনালি আঁশ’ নামে পরিচিত পাট ছিল দেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল। কিন্তু মেহেরপুরে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। চলতি মৌসুমে তীব্র খরা, অনাবৃষ্টি ও বাড়তি খরচের কারণে বড় ধরনের সংকটে পড়েছেন চাষিরা। তবে সে তুলনায় মিলছে না দাম। অনেক কৃষকই বলছেন, এভাবে লোকসান গুনতে হলে আগামী বছর পাটের আবাদ থেকে সরে দাঁড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
এই হতাশার পেছনে রয়েছে উৎপাদন ও বাজার— দুই দিকেরই সংকট। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে ২ হাজার ৮০০ কৃষককে পাটচাষে উৎসাহিত করতে প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হয়েছে সার ও বীজ। প্রণোদনা পাওয়া কৃষকদের পাশাপাশি ভালো দামের আশায় অনেকে আবাদ করেছেন ফসলটি। জেলায় পাট আবাদ হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে। এ থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার বেল।
কৃষকদের ভাষ্য, যেখানে প্রতি বিঘায় ১৫-১৭ মণ পাট পাওয়ার আশা ছিল, সেখানে মিলছে মাত্র ৭-৮ মণ। অন্যদিকে বাজারে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। এই দামে উৎপাদন খরচই উঠছে না।
গাংনী উপজেলার কৃষক রুহুল আমিন এ বছর তিন বিঘা জমিতে আবাদ করেছেন পাট। জমি প্রস্তুত থেকে পাট কাটার আগ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। এরপর পাট কাটতে শ্রমিকের মজুরি দিতে হচ্ছে আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকা। জমি থেকে পাট বহন, পানিতে পচানো ও আঁশ ছাড়াতে ব্যয় হচ্ছে আরও প্রায় ১০ হাজার টাকা।
তার দাবি, তিন বিঘা জমির পাট কাটাসহ অন্যান্য কাজে প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ হলেও পাট বিক্রি করে সেই অর্থও উঠছে না।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন সদর উপজেলার ঝাউবাড়িয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল মোমিন। তার ভাষায়, ‘টানা পাঁচ বছর পাটচাষ করে লোকসান হয়েছে। এ বছর ভালো দাম পাওয়ার আশা করেছিলাম। কিন্তু সেই প্রত্যাশাও পূরণ হয়নি।’
কৃষকদের অভিযোগ শুধু ফলন কম নয়, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধানও এবার ছিল বড়। তারা বলছেন, কৃষি বিভাগের দেওয়া তোষা পাট-৮ ও ৯ জাতের বীজের বিষয়ে বলা হয়েছিল প্রতিটি গাছ ৮-১০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হবে। আঁশ হবে মোটা। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ জমিতে গাছের উচ্চতা হয়েছে পাঁচ-ছয় ফুট। ফলে উৎপাদন যেমন কমেছে, তেমনি আঁশের মানও খারাপ।
এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বাস্তবতা, যা কৃষকের আয়কে আরও সীমিত করে দিচ্ছে। দেশের অনেক জেলায় পাট কেটে পানিতে পচিয়ে আঁশ সংগ্রহের পর তা শুকিয়ে বাজারজাত করেন কৃষক। কিন্তু মেহেরপুরের অধিকাংশ কৃষক কাঁচা অবস্থাতেই পাট বিক্রি করতে বাধ্য হন।
অবশ্য সংকটের পেছনে আবহাওয়ার পাশাপাশি ব্যবস্থাপনাগত কারণও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। কৃষিবিদ মতিয়ার রহমান মনে করেন, পাটচাষে পর্যাপ্ত নাইট্রোজেন এবং নিয়মিত বৃষ্টিপাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরিয়া সারে প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন থাকলেও অনেক কৃষক সময়মতো সার প্রয়োগ করেননি। পাশাপাশি খরার সময় প্রয়োজনীয় সেচও দেওয়া হয়নি। ফলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে এবং ফলন কমেছে।
তবে সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি— মনে করছে কৃষি বিভাগ। মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সঞ্জীব মৃধার দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় ৩ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। কৃষক যদি পাট শুকিয়ে সংরক্ষণ করে বিক্রি করতে পারেন, তাহলে সম্ভাবনা থাকবে ভালো দাম পাওয়ার।




