সোনারগাঁ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়: হারিয়েছে বিদ্যাপীঠ, রয়ে গেছে স্মৃতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একসময় হাজারো শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর ছিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ। সেখানে গড়ে উঠেছিল বাংলার প্রাচীন ইসলামি জ্ঞানচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ও হাদিসের বিদ্যাপীঠ। জ্ঞানতাপস শেখ শরফ উদদীন আবু তাওয়ামার (রহ.) প্রতিষ্ঠিত সেই বিদ্যাপীঠ কালের স্রোতে হারিয়ে গেছে। নেই তার মূল স্থাপনা, নেই সেই কোলাহলমুখর শিক্ষাঙ্গন। তবে ইতিহাসের সেই গৌরব আজও মুছে যায়নি— ষোলপাড়ার মাজার ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কিছু নিদর্শন বহন করে চলছে প্রায় ৮০০ বছরের পুরনো জ্ঞানচর্চার স্মৃতি।
সেই ইতিহাসের টানেই এখনো প্রতিদিন মোগরাপাড়ার ষোলপাড়ায় আসেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। কেউ আসেন মাজার জিয়ারতে, কেউবা প্রাচীন ইসলামি শিক্ষার ইতিহাস জানতে। স্থানটি শুধু ধর্মীয়ভাবে নয়, ইতিহাস, শিক্ষা ও প্রত্নঐতিহ্যের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী, শেখ শরফ উদদীন আবু তাওয়ামার (রহ.) জন্মস্থান নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো সূত্রে তার জন্মস্থান পারস্যের বুখারা অঞ্চল, আবার কোথাও ইয়েমেনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আনুমানিক ১২৭৭ খ্রিস্টাব্দে সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবনের শাসনামলে তিনি দিল্লিতে আসেন। পরে ইসলাম প্রচার ও জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্যে বাংলায় আগমন করেন। সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়ার ষোলপাড়াকে তিনি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেন। সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন একটি হাদিসচর্চাকেন্দ্র ও ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যা পরে ‘সোনারগাঁ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে পরিচিতি পায়। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়েও এখানে পাঠদান করা হতো বলে ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
শেখ শরফ উদদীন ছিলেন ইসলামি আইন, ধর্মতত্ত্ব ও হাদিসশাস্ত্রে সুপণ্ডিত। তার জ্ঞানচর্চা শুধু ধর্মীয় বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ভেষজবিদ্যা, গণিত, ভূগোল, রসায়নসহ বিভিন্ন জ্ঞানশাখায়ও তার পাণ্ডিত্যের কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়।
দীর্ঘ সময় ধরে এখানে শিক্ষা দেওয়ার পর প্রায় ১৩০০ খ্রিস্টাব্দে শেখ শরফ উদদীন মৃত্যুবরণ করেন। তাকে মোগরাপাড়ার ষোলপাড়ায় দাফন করা হয়। তার মৃত্যুর পরও কিছু সময় শিক্ষাকেন্দ্রটির কার্যক্রম চালু ছিল বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় জানা যায়।
সেই প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল স্থাপনার অস্তিত্ব নেই। তবে ষোলপাড়ায় পাশাপাশি থাকা কয়েকটি মাজারের মধ্যে সবুজ রঙের একটি মাজারকে শেখ শরফ উদদীন আবু তাওয়ামার (রহ.) মাজার হিসেবে স্থানীয়ভাবে চিহ্নিত করা হয়। এ মাজারই এখন হারিয়ে যাওয়া সেই জ্ঞানকেন্দ্রের স্মৃতির অন্যতম দৃশ্যমান চিহ্ন।
সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক শাহেদ কায়েসের ভাষায়, আনুমানিক ১২৭৮ খ্রিস্টাব্দে উজবেকিস্তান থেকে আসা শেখ শরফ উদদীন আবু তাওয়ামা মোগরাপাড়ায় হাদিসচর্চা ও শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষাকেন্দ্রটির পাশে একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারও ছিল। কালের প্রবাহে মূল স্থাপনার অধিকাংশ বিলীন হলেও কিছু ধ্বংসাবশেষ এখনো টিকে আছে।
শেখ শরফ উদদীন আবু তাওয়ামার মৃত্যুর পরও শিক্ষাকেন্দ্রটির কার্যক্রম অব্যাহত ছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। কবি আবদুল হাই শিকদারের ‘সোনারগাঁও: অন্তরে বাহিরে রূপকথা’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, এটি সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের শাসনামল পর্যন্ত টিকে ছিল। পরে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং রাজা গণেশের ক্ষমতায় আরোহণের সময় প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংস হয়ে যায় বলে ধারণা করা হয়।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় আঞ্চলিক পরিচালক ড. মোছা. নাহিদ সুলতানা জানিয়েছেন, শেখ শরফ উদদীনের মাজার ও প্রাচীন ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থানটি তিনি পরিদর্শন করবেন। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় এনে স্থানটি সংরক্ষণের পরিকল্পনা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নেওয়ার কথাও তিনি জানিয়েছেন।



