লক্ষ্মীপুর
নদী পাড়ের বসতিতে দুর্ভোগের জোয়ার

মেঘনার তীরে ঘর। চারপাশে নদীর জলরাশি। কিন্তু সেই নদীই যখন অমাবস্যা-পূর্ণিমার জোয়ারে ফুলে ওঠে তখন আশীর্বাদ নয়, দুর্ভোগ হয়ে দাঁড়ায় উপকূলের মানুষের জন্য। পানিতে ডুবে যায় রাস্তাঘাট, উঠোন, ফসলি জমি, চলাচলের পথ। কখনো পানি ঢুকে পড়ে বসতঘরেও।
৬০ বছরের বৃদ্ধা সালেহা বেগম বসে আছেন খাটের ওপর। ঘর থেকে বের হওয়ার উপায় নেই। বাড়ির চারপাশে হাঁটুপানি।
মেঘনা নদীর তীরে বসবাস করায় বর্ষা মৌসুমে প্রতি অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় দিনের-রাতের একটা বড় সময় পানিবন্দি থাকতে হয় তাকে।
আক্ষেপ করে সালেহা বেগম বলেন, পানির কারণে বের হতে পারি না। খাটের ওপর বসে আছি। আমাদের দুঃখ-কষ্টের মধ্যেই বসবাস করতে হয়।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেলে লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চরমার্টিন ও চর কালকিনি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও রাস্তায় পানি, কোথাও বাড়ির উঠোনে। ফসলি জমি ও বাগানও ডুবে আছে পানিতে। ময়লাযুক্ত পানিতে ছোট ছোট শিশুরা চলাফেরা করছে। আর বৃদ্ধ নারী-পুরুষেরা অনেকটা ঘরবন্দি জীবন কাটাচ্ছেনউঠোনে পানি ওঠায় অনেক গৃহস্থ গবাদিপশু বাড়ির বাইরে উঁচু রাস্তায় বেঁধে রেখেছেন। পানির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই যেন তাদের প্রতিদিনের জীবন।
চর কালকিনি এলাকার বাসিন্দা ঘরবন্দি সালেহা বেগমের মেয়ে কাঞ্চন বেগম বলেন, জোয়ারের পানিতে বাড়ির চারপাশ ডুবে আছে। কোথাও যেতে পারি না। শুক্রবার পানি বসতঘরে ওঠেনি। তবে বৃহস্পতিবার পানি ঘরেও উঠেছে। তখন কষ্ট আরও বেশি হয়। বিশেষ করে রাতের বেলায় পানি উঠলে চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়ি।
তার ভাষ্য, প্রতি মাসে অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় নদীতে জোয়ারের পানি বেড়ে যায়। টানা তিন থেকে চার দিন দিনে দুবার করে পানি আসে। একেকবার পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত পানি থাকে। তখন পানিবন্দি থাকা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় থাকে না।
এ যেন প্রকৃতির সঙ্গে দীর্ঘদিনের এক অনিবার্য লড়াই। ক্যালেন্ডারে অমাবস্যা-পূর্ণিমা এলেই উপকূলের এসব মানুষের মনে তৈরি হয় নতুন করে আতঙ্ক কখন পানি উঠবে, কতটা উঠবে, আর কতক্ষণ থাকবে।
মর্জিনা বেগমের দুর্ভোগ আরও বেশি। তিনি বলেন, জোয়ারের পানি রান্নার চুলোতে ঢুকে পড়েছে। এতে রান্নাবান্না করতে পারি না। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে খুবই কষ্টে দিন কাটাতে হয়। এভাবে গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আমরা যখন পানিবন্দি থাকি, তখন কোনো জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসন আমাদের খবর রাখে না।
শুধু মানুষের চলাচল নয়, জোয়ারের পানি ক্ষতি করছে বসতবাড়িরও। চরমার্টিন এলাকার বাসিন্দা মো. সেলিম ও মো. হাসেম বলেন, জোয়ারের পানিতে রাস্তাঘাট বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। বাড়ির উঠোন ডুবে যায়। পানি নামার সময় বসতঘরের ভিটার মাটি খসে পড়ে। এতে ঘরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
গবাদিপশু নিয়েও তাদের বিড়ম্বনার শেষ নেই। তারা বলেন, পানি উঠলে গরু-ছাগল নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়। দিনের বেলায় উঁচু রাস্তায় বেঁধে রাখা গেলেও রাতের বেলায় হাঁটুপানির মধ্যেই রাখতে হয়। জোয়ারের পানি শুধু বসতবাড়ি কিংবা রাস্তাঘাট ডুবিয়ে দেয় না, কেড়ে নেয় কৃষকের আবাদ করার সুযোগও।
আবু তাহের ও নুরুল ইসলাম বলেন, নদীসংলগ্ন ফসলি জমিতে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ে। এ কারণে এসব জমিতে আউশ বা আমনের আবাদ করা যায় না। এখন আমন ধানের চারা রোপণের মৌসুম। কিন্তু এসব জমিতে চারা লাগালে পানিতে তলিয়ে থাকবে। পানি নামার সময় স্রোতের সঙ্গে চারাগুলোও উঠে যাবে। ফলে অনেক জমি অনাবাদি পড়ে থাকে।
অর্থাৎ জোয়ারের পানি নামলেও দুর্ভোগ শেষ হয় না। কৃষকের জমি পড়ে থাকে অনাবাদি, নষ্ট হয় সম্ভাব্য ফসল। পরিবারের আয়-রোজগারেও এর প্রভাব পড়ে।
দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তির পথ হিসেবে নদীর তীররক্ষা বাঁধ ও খালের মুখে স্লুইসগেট নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ভুক্তভোগীরা বলেন, যেসব এলাকায় উঁচু বাঁধ নির্মাণ হয়েছে, সেখানে জোয়ারের পানি ঢুকছে না। তাই দ্রুত তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খালের মুখে স্লুইসগেট নির্মাণ করা হলে জোয়ার-ভাটার পানি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
তারা জানান, রামগতি ও কমলনগরের ৩১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। তবে কাজের ধীরগতির কারণে এখনো জোয়ারের পানিতে উপকূলীয় এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে। তাই দ্রুত তীররক্ষা বাঁধ ও খালের মুখে স্লুইসগেট নির্মাণকাজ শেষ করার দাবি তাদের।
লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ উজ জামান খান বলেন, মেঘনা নদীর তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এতে নদীভাঙন রোধ হয়েছে। বাঁধ দৃশ্যমান হলে উপকূলে জোয়ারের পানি ঢুকতে পারবে না। খালের মুখে স্লুইসগেটও নির্মাণ করা হবে। এতে জোয়ার-ভাটার পানি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।







