ঈদ এলেই জ্বলে ওঠে কামারপাড়ার আগুন

ছবি: আগামীর সময়
পবিত্র ঈদুল আজহা যত ঘনিয়ে আসে, ততই ব্যস্ত হয়ে ওঠেন কামারপাড়ার কারিগররা। বছরের অন্য সময় তুলনামূলক শান্ত থাকলেও কোরবানির ঈদকে ঘিরে তাদের কর্মচাঞ্চল্য চোখে পড়ার মতো। আগুনের তাপে লোহা গলিয়ে, হাতুড়ির আঘাতে ছুরি, দা, বটি ও চাপাতি তৈরি করতে দিন-রাত এক করে কাজ করছেন তারা।
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া পৌর শহরের দক্ষিণ বন্দর এলাকার কামারপাড়ায় গেলেই এখন শোনা যায় হাতুড়ির টুংটাং শব্দ। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একটানা চলছে কাজ। রাত যত গভীর হয়, ততই যেন বাড়ে কর্মব্যস্ততা। আগুনের লেলিহান শিখা আর লোহার ঝনঝন শব্দ জানান দেয়, কোরবানির ঈদ আর বেশি দূরে নয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, কামারপাড়ার প্রতিটি কারখানায় চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কেউ তৈরি করছেন কোরবানির পশু জবাইয়ের ছুরি, কেউ বানাচ্ছেন দা, বটি বা চাপাতি। কয়লার আগুনে লোহা লাল করে তা পিটিয়ে প্রয়োজনীয় আকৃতি দিচ্ছেন কারিগররা। তীব্র গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করলেও থামার সুযোগ নেই তাদের।
কারিগরদের ভাষ্য, সারা বছরের তুলনায় ঈদের এই সময়টাতেই সবচেয়ে বেশি কাজের চাপ থাকে। অনেকেই নতুন সরঞ্জাম কিনতে আসেন, আবার অনেকে পুরোনো দা-বটি ধার করাতে নিয়ে আসেন। ফলে কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
পৌর শহরের প্রবীণ কামার সুশীল কর্মকার বলেছেন, ‘সারা বছর ব্যবসা খুব একটা ভালো চলে না। কোরবানির ঈদের সময়টার জন্যই আমরা অপেক্ষা করি। এই মৌসুমে যা আয় হয়, তা দিয়েই বছরের অনেকটা সময় চলে। তবে এবার তীব্র গরমে কাজ করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। তারপরও কাজ থামানোর সুযোগ নেই।’
কামারপাড়ায় আসা ক্রেতারাও ব্যস্ত। ঈদের আগে ভিড় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই আগেভাগে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনে নিচ্ছেন। কেউ ছুরি কিনছেন, কেউ দা বা বটি। আবার অনেকেই পুরোনো যন্ত্রপাতি শান দিয়ে নিচ্ছেন।
বাজারে যন্ত্রপাতির আকার ও মানভেদে বিভিন্ন দাম রয়েছে। সাধারণ ছুরি ১০০ থেকে ৩৫০ টাকা, চাপাতি ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, বটি ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং পশু জবাইয়ের বড় ছুরি ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি দা, বটি ও ছুরিতে শান দেওয়ার কাজও করছেন কারিগররা।
তবে কর্মব্যস্ততা থাকলেও কামারশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে কারিগরদের। তাদের দাবি, কয়লা ও লোহার দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই তুলনায় লাভ কমে গেছে। নতুন প্রজন্মও এই পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে। ফলে শত বছরের পুরোনো এই শিল্প ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
তবু সব শঙ্কা ভুলে ঈদ এলেই নতুন প্রাণ ফিরে পায় কামারপাড়া। আগুনের উত্তাপ, হাতুড়ির শব্দ আর কারিগরদের ঘামে তৈরি হয় কোরবানির প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। তাই ঈদুল আজহা শুধু কোরবানির উৎসব নয়, কামারপাড়ার মানুষের জন্য এটি জীবিকা ও আশারও এক বিশেষ সময়।






