মারা গেল আলীবান্দা ইকো-ট্যুরিজমে জন্ম নেওয়া প্রথম হরিণশাবকটি
- ২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর ছাড়া হয় ৫টি হরিণ
- ৬ মাস পর জন্মের একদিনের মাথায় মৃত্যু
- বসবাস উপযোগী না করেই রাখা হয় হরিণ, অভিযোগ পরিবেশবাদীদের
- হিট স্ট্রোকে মৃত্যু দাবি বনবিভাগের
- সংশ্লিষ্টদের অবহেলার অভিযোগ স্থানীয়দের

ছবি: আগামীর সময়
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের আলীবান্দা ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রে প্রথম জন্ম নেওয়া হরিণশাবকটি মারা গেছে। ঘটনাটি বনবিভাগ গোপন রাখার চেষ্টা কররেও তা ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন মাধ্যমে। একমাত্র হরিণশাবকটি জন্মের মাত্র একদিনের মাথায় মৃত্যু হওয়ায় স্থানীয় পরিবেশবাদী ও সচেতন মহলে দেখা দিয়ে নানা প্রশ্ন।
তাদের অভিযোগ, বণ্যপ্রাণী বসবাসের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত না করেই কেন্দ্রিটিতে হরিণ রাখা হয়েছে। পাশপাশি বনবিভাগের অবহেলা ও সঠিক নজরদারির অভাবে নবজাতক শাবকটির মৃত্যু ঘটেছে।
তবে বনবিভাগ বলছে, গত কয়েকদিন ধরে প্রচণ্ড দাহদাহ বয়ে যাচ্ছে উপকূল থেকে। গরম সইতে না পেরে সদ্যজাত হরিণ শাবকটি মারা যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালে শেষ হয় আলীবান্দা ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রটির নির্মাণ কাজ। এরপর ২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর উকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রটি উন্মুক্ত করা হয় পর্যটকদের জন্য। পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে বেস্টনিতে ছাড়া হয় পাঁচটি হরিণ। এর মধ্যে চারটি স্ত্রী ও একটি পুরুষ হরিণ রয়েছে। এরপর ৬ মাসের মাথায় গত ২ জুন শাবটির জন্ম দেয় একটি মা হরিণ। জন্মের পর সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকলেও ৩ জুন মারা যায়। প্রথম জন্ম নেওয়া হরিণ শাবকটির মৃত্যুতে স্থানীয়দের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে ক্ষোভ ও হতাশা।
সুন্দরবনসংলগ্ন সাউথখালী গ্রামের সচেতন নাগরিক মো. আলমগীর হোসেন জানালেন, সুন্দরবনের মধ্যেই বন্যপ্রাণী খাচায় আটকে রেখে পালন করা কঠিন। তারপরও আলীবান্দায় হরিণ রাখার স্থানটি একেবারে ফাঁকা, কোনো গাছপালা নেই। এই গরমে হরিণগুলো বিশ্রাম নেবে এমন সুযোগ নেই। বেস্টনির মধ্যে পর্যাপ্ত গাছ লাগানো প্রয়োজন।
বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় নিয়োজিত ওয়াইল্ড টিমের শরণখোলা ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর মো. আলম হাওলাদার বললেন, প্রথম জন্ম নেওয়া হরিণ শাবকটি মারা যাওয়া খুবই দুঃখজনক। বেস্টনির এক পাশে ছোট্ট একটি পাকা শেড রয়েছে হরিণের বিশ্রামের জন্য। কিন্তু বেস্টনির ভেতরে খোলা জায়গায় কোনো গাছপালা না থাকায় পুরো পরিবেশটাই উত্তপ্ত থাকে। হরিণগুলো ছুটোছুটি করে খোলা জায়গায় বিশ্রাম নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। হরিণ বসবাসের পরিবেশ তৈরি করা না গেলে আরো দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
সুন্দরবন সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি ফরিদ খান মিন্টুর মতে, হরিণ খুবই সংবেদনশীল একটি প্রাণী। তার বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠার জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে বনবিভাগকে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রিয় যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’ সংগঠনের সমন্বয়কারী মো. নূর আলম শেখ হরিণ শাবকটি মারা যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার বক্তব্য, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী রাখা হয়। বিষয়টি ইতবাচক হিসেবেই দেখা হয়। এতে মানুষ বন্যপ্রাণী সম্পর্কে খুব কাছ থেকে দেখা ও তার জীবনাচরণ সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়।
তিনি আরো যোগ করেন, বন্যপ্রাণীকে আটকে রাখলেও তার মধ্যে যাতে প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় থাকে সেই ব্যবস্থা রাখা জরুরি। পর্যাপ্ত ছায়া, সুপেয় পানি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পরিচর্যার অভাব থাকলে যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে। তদন্তের মাধ্যমে হরিণ শাবকটির মৃত্যুর কারণ জানা দরকার। ভবিষ্যতে এ ধরণের ঘটনা যাতে না ঘটে, সেব্যাপারে বন বিভাগকে আরো সচেতন থাকতে হবে।
হরিণ শাবকটির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে পূর্ব সুন্দরবেনর শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বনসংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরিফুল ইসলামের ভাষ্য, প্রচণ্ড গরমে হিট স্ট্রোকে হরিণ শাবকটি মারা যেতে পারে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মৃত শাবকটি কেন্দ্রের পাশের বনাঞ্চলে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগ বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বললেন, গরমের কারেণই হরিণ শাবকটি মারা গেছে বলে ধারণা করছি। বেস্টনির এক পাশে একটি পাকা শেড রয়েছে, সেখানে হরিণ বিশ্রাম নিতে পারে। কিন্তু বেস্টনির মধ্যে ফাঁকা স্থানে গাছ না থাকায় একটু সংকট তৈরি হয়েছে।
সামনের বর্ষা মৌসুমে ফাঁকা জায়গায় পর্যাপ্ত গাছ লাগানো হবে। যাতে ছায়াযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া বেস্টনিতে থাকা হরিণগুলোর প্রতি সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট এলাকার বন কর্মকর্তা-কর্মচরীদের, যোগ করেন তিনি।




