শ্রমের হাটে কাজের অপেক্ষা

শ্রমিকদের এই সমাগমকে অনেকে বলেছেন ‘শ্রম বিক্রির হাট’।
তখনো পুব আকাশে দেখা মেলেনি সূর্যের। ভোরের আলো ফুটতে এখনো ঢের বাকি। এরই মধ্যে কাস্তে-কোদাল নিয়ে জড়ো হয়েছেন শত শত শ্রমিক। কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের হাঁকডাকে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। শ্রমিকদের এই সমাগমকে অনেকে বলেছেন ‘শ্রম বিক্রির হাট’। বলছিলাম মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলা থানার মোড়ের কথা। যেখানে অর্ধশতাব্দী ধরে চলে আসছে শ্রম বেচাকেনা।
দীর্ঘ সারি ধরে শ্রমিকরা অপেক্ষা করছেন কাজের জন্য। কেউ কেউ ক্রেতাদের বলছেন পারিশ্রমিকের কথা। ক্রেতারাও এসে দরকষাকষি করছেন তাদের সঙ্গে। মজুরি নির্ধারণ শেষে অটোরিকশা বা ভ্যানে করে রওনা হচ্ছেন গন্তব্যস্থলে। কেউ আবার কাজ না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন বাড়ি।
পাট কাটা, ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার, মাটি কাটার কাজ করেন তারা। মানুষের শ্রম কেনাবেচার এ হাটে সুঠামদেহী কম বয়সী শ্রমিকের চাহিদা বেশি। তিন বছর ধরে কলাবাড়ী এলাকায় শ্রম বিক্রি করতে আসেন বিকাশ হালদার (২৩)। পাশাপাশি পড়ালেখাও করেন। মূলত পড়ালেখার খরচ ও পরিবারের চাহিদা মেটাতেই শ্রম বিক্রি করতে আসেন তিনি।
বিকাশ হালদারের ভাষায়, ‘গ্রামে তেমন কোনো কাজ নেই। দিনে ৫০০-৬০০ টাকার বিনিময়ে মানুষ আমাদের কিনে নিয়ে যান। আবার পাট কাটা বা জাগ দেওয়ার কাজ হলে ৮০০-১০০০ টাকাও দেন।’
তবে প্রতিদিন নিয়তি পক্ষে থাকে না সবার। দীর্ঘ প্রতীক্ষায়ও মেলে না কাজ। মাঝেমধ্যে কিছু শ্রমিক অবিক্রীত থেকে যান। পরের দিন কাজের সন্ধানে আবারও থানার মোড় আসতে হয় তাদের। এমনই একজন আমগ্রাম থেকে আসা উৎপল বিশ্বাস (৫০)। তিনি বললেন, ‘বনিবনা না হওয়ায় কাজ পাইনি। তাই বাসায় চলে যাচ্ছি। তবে কাজ থাকুক আর না থাকুক প্রতিদিন খাবারের জন্য টাকা প্রয়োজন। কাজ কম থাকলে আমাদের সমস্যায় পড়তে হয় অনেক।’
শ্রমিক নিতে আসা লোকমান হাওলাদারের ভাষ্য, ‘দুই বিঘা জমির পাট কাটতে শ্রমিক নিতে এসেছি। চারজনকে নিয়েছি। তারা কাজ করেন ভোর ৬টা থেকে জোহরের আজান পর্যন্ত; কাজেও মনোযোগী। শ্রমিকের মজুরি কিছুটা বেশি হলেও শ্রমিক দিয়ে কাজ করিয়ে আমি সন্তুষ্ট।’
রাজৈর থানার মোড় বণিক সমিতির সভাপতি লিটন শেখ জানালেন, থানার মোড়ে অন্তত ৫০ বছর ধরে শ্রম বেচাকেনা হয়ে আসছে। উপজেলার আমগ্রাম ইউনিয়ন, বাজিতপুর ইউনিয়ন এবং পার্শ্ববর্তী কোটালিপাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকরা এখানে আসেন কাজের সন্ধানে। হাটে দালাল কিংবা তৃতীয়পক্ষ না থাকায় ক্রেতারা নিজে এসে দরদাম করে শ্রমিকদের নিয়ে যান।’






