শিশু আদিব হত্যার রহস্য উন্মোচন, দায় স্বীকার কিশোরের

পবিত্র রমজান মাস। পরিবারের সঙ্গে ইফতার করে তারাবির নামাজ পড়তে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ১১ বছরের আদিব আহনাফ। কিন্তু আর ফিরে আসেনি সে। পরদিন সকালে রাজশাহীর কর্ণহার থানার বিল ধরমপুর গ্রামের একটি ঘাসক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয় তার নিথর দেহ। চার মাসের বেশি সময় ধরে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য অবশেষে উদঘাটন করেছে পুলিশ।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) জানিয়েছে, ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও প্রতিশোধের বশবর্তী হয়ে আদিবকে হত্যা করে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর। ইতোমধ্যে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সে হত্যার দায় স্বীকার করেছে।
আজ মঙ্গলবার আরএমপির মুখপাত্র ও উপপুলিশ কমিশনার মো. গাজিউর রহমান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের তথ্য জানান।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত ১ মার্চ রাতে তারাবির নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয় আদিব। দীর্ঘ সময় পার হলেও সে বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করে। পরদিন সকালে বিল ধরমপুর কৈচাপুকুর এলাকায় তার বাবার ঘাসক্ষেত থেকে আদিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মরদেহে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। গলায় পেঁচানো ছিল একটি বেল্ট। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। পরে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করে ডিবি পুলিশ। পরে মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। দীর্ঘ অনুসন্ধান, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন সূত্র যাচাইয়ের পর তদন্তকারীরা হত্যার রহস্য উন্মোচন করতে সক্ষম হন।
তদন্তে উঠে আসে, একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ক্ষোভ থেকেই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে অভিযুক্ত কিশোর জানায়, এক মেয়ের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্কের পাশাপাশি তাদের মধ্যে শারীরিক ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিও জানতে পারে আদিব। পরে আদিব বিষয়টি মেয়েটির মাকে জানিয়ে দেয়। মেয়েটির মা আবার ঘটনাটি অভিযুক্ত কিশোরের মাকে জানায়। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর মায়ের কাছে মারধরের শিকার হয় ওই কিশোর।
পুলিশের ভাষ্যমতে, সেই অপমান ও ক্ষোভ থেকেই প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে। সুযোগ খুঁজতে থাকে আদিবকে আঘাত করার।
ঘটনার দিন তারাবির নামাজ পড়তে বের হলে কৌশলে আদিবকে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যায় অভিযুক্ত কিশোর। সেখানে প্রথমে তার মাথায় আঘাত করা হয়। পরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় তাকে। হত্যার পর মরদেহ ফেলে রেখে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে অভিযুক্ত।
ডিবি পুলিশের দাবি, তদন্তে পাওয়া তথ্য, আলামত এবং আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা স্পষ্ট হয়েছে। এসব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযুক্ত কিশোরকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
একটি পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের জটিলতা, কিশোর বয়সের আবেগ এবং প্রতিশোধের মানসিকতা- সবকিছুর করুণ পরিণতি হয়ে সামনে এসেছে আদিবের মৃত্যু। তারাবির নামাজে যাওয়ার পথে যে শিশুটি আর বাড়ি ফিরতে পারেনি, তার মৃত্যুর রহস্য উন্মোচিত হলেও স্বজনদের শোক আর শূন্যতা রয়ে গেছে আগের মতোই।




