ছোট শহরে বড় জট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আয়তনে ছোট ফেনী শহর। শহরের আয়তন ও সড়কব্যবস্থা বিবেচনায় সাড়ে ৯ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচলের অনুমোদন রয়েছে। অথচ চলাচল করছে প্রায় ২৭ হাজার। এর বাইরে রয়েছে প্রায় ১০ হাজার অনুমোদনহীন ইজিবাইক। যত্রতত্র স্ট্যান্ড, বেপরোয়া চলাচল আর যানজটে নাকাল নগরবাসী। যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা কারনো এবং দ্রুতগতিতে চলাচলে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও।
ফেনী ট্রাফিক বিভাগ ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, জেলায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন রয়েছে সাড়ে ৯ হাজার। অথচ চলাচল করছে প্রায় ২৭ হাজার। অর্থাৎ অনুমোদনের তুলনায় অতিরিক্ত গাড়ির সংখ্যা সাড়ে ১৭ হাজারের বেশি। এসব গাড়ির প্রায় অর্ধেক চলাচল করে ফেনী শহরে। এর বাইরে অনুমোদনহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শহরে যানবাহনের এই অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টির পেছনে রয়েছে নিয়ন্ত্রণহীন প্রবেশ ও প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতি। বিভিন্ন উপজেলা থেকে শহরে আসা সিএনজিচালিত অটোরিকশার যাত্রী নামিয়ে ফিরে যাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর টানা ১৫ দিন সড়কে ট্রাফিক পুলিশ না থাকার সুযোগে উপজেলার অনেক গাড়ি শহরে প্রবেশ করে। এরপর থেকে সেগুলোর চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিআরটিএর ফেনী কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ফয়সাল আহমেদ জানিয়েছেন, শহরের আয়তন ও সড়কব্যবস্থা বিবেচনায় সাড়ে ৯ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আরও কিছু আবেদন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তার মতে, ১৫ বছরের পুরনো গাড়ি সড়ক থেকে প্রত্যাহার এবং উপজেলার গাড়ির শহরে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে যানজট ও বিশৃঙ্খলা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের সংখ্যাও বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। দুই বছর আগেও শহরে এসব গাড়ির সংখ্যা ছিল ৪০০-৫০০। এখন তা বেড়ে প্রায় ১০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। ফলে সীমিত সড়কে যানবাহনের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে ট্রাফিক বিভাগ।
শহরের গোডাউন কোয়ার্টার এলাকার বাসিন্দা ফজলুল কাদের শামীমের ভাষায়, এসব গাড়ির চাপে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করা যায় না। যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। বিশেষ করে ট্রাংক রোড থেকে সদর হাসপাতাল মোড়গামী সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলো বেপরোয়া গতিতে চলে। সম্প্রতি এসব গাড়ির ধাক্কায় ফেনী জিএ একাডেমি উচ্চবিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়েছে।
যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি চালকদের অসচেতনতা ও প্রশিক্ষণের অভাব পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে বলে মনে করছেন সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন (নিসআ) ফেনী শাখার সংগঠক জিয়াউদ্দিনের মতে, শহর ছোট হলেও যানবাহনের সংখ্যা অনেক বেশি। সকাল ও সন্ধ্যায় সড়কে সিএনজি ও ইজিবাইকের আধিক্যে অন্য যানবাহনের চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।
সেফ রোডস বাংলাদেশের ফেনী শাখার মুখ্য সমন্বয়ক মনসুর উদ্দিন রকি জানালেন, যানজট নিরসনে তাদের সংগঠনের সদস্যরা ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে কাজ করছেন। তিনি মনে করেন, শুধু যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না, চালকদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
শহরে অতিরিক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচলের বিষয়টি স্বীকার করেছেন মালিক সমিতির নেতারাও। মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল ওয়াদুদ রনি বললেন, ‘১৪-১৫ বছর ধরে চলাচল করছে কিংবা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে— এমন গাড়িগুলো সড়ক থেকে প্রত্যাহার করা হলে যানবাহনের চাপ কমবে।’
সীমিত সড়কে বিপুলসংখ্যক যানবাহনের এই চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফেনী পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সামছুদ্দিনের ভাষ্য, পৌরসভার পক্ষ থেকে শহরের বিভিন্ন স্থানে সিএনজিচালিত অটোরিকশার জন্য স্ট্যান্ড নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চালকরা নির্ধারিত স্থান ব্যবহার না করে যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করেন। এতে যান চলাচলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে।
অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের কথা স্বীকার করেছেন জেলা ট্রাফিক পরিদর্শক (অ্যাডমিন) মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেনও। তিনি বললেন, ‘রাস্তায় গাড়ি নেমে গেলে তা ইচ্ছা করলেই সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে শহরের প্রবেশমুখগুলোয় অতিরিক্ত গাড়ি আটকে দিয়ে মূল শহরে যানবাহনের চাপ কমানোর চেষ্টা চলছে।’




