কিশোরী ইয়াসমিন হত্যার ৩১ বছর, অবহেলায় স্মৃতিস্তম্ভ-পাঠাগার

২০০১ সালের জানুয়ারিতে নির্মিত হয় শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ ইয়াসমিন যাত্রীছাউনি ও পাঠাগার। যার অবস্থা এখন বেহাল। ছবি: আগামীর সময়
দিনাজপুরের কিশোরী ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার ৩১ বছর আজ। ১৯৯৫ সালের এই দিনে তার মরদেহ ফেলে রাখা হয় মহাসড়কের পাশে। তার স্মরণে পরের বছরের ২৪ আগস্ট থেকে পালন করা হয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। দিনাজপুরের দশমাইল এলাকায় ২০০১ সালের জানুয়ারিতে জেলা পরিষদের অর্থায়নে নির্মিত হয় শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ ইয়াসমিন যাত্রীছাউনি ও পাঠাগার। সেগুলোর অবস্থা এখন বেহাল।
গতকাল রবিবার সকালে সরেজমিনে স্মৃতিস্তম্ভ যাত্রীছাউনি ও পাঠাগার ভবনটিতে গিয়ে দেখা যায়, যাত্রীছাউনিতে কোনো যাত্রী নেই, রয়েছে দোকান। আর নিচতলায় হলরুমের মতো জায়গাটায় সিগারেটের উচ্ছিষ্ট আর ধুলাময়লা। দ্বিতল ভবনে ওঠার সিঁড়ির গোড়ায় কলাপসিবল গেটে ঝুলছে তালা। সিঁড়ির নিচে জমে আছে ময়লা পানি ও আবর্জনা। তার পাশেই ছোট একটি কক্ষে পোস্ট অফিসের কার্যক্রম চলছে। ভবনের সামনের অংশ দখলে নিয়েছেন ফল ব্যবসায়ীরা।
পাঠাগারে গিয়ে দেখা যায়, ধূলোর আস্তরণ জমেছে, নেই কোনো বই। পাঠাগার বিরাজ করছে ভূতুড়ে পরিবেশ।
ভবনের সামনের ফলের দোকানদার মো. বিপ্লব জানান, পাঠাগারটিতে এখন কেউ আসেনা। ধুলোর আস্তরন জমেছে। তবে পাঠাগার চালুর জন্য স্থানীয় যুবকরা উদ্যেগ নিলেও তা সফল হয়নি।
দশমাইল এলাকার আরেক ফল ব্যবসায়ী মন্তব্য করেন, ভবন প্রতিষ্ঠার পর কয়েক বছর পাঠাগারটিতে স্থানীয় তরুণ-যুবকদের যাতায়াত ছিল। তারপর ১২-১৫ বছর ধরে কোনো কার্যক্রম নেই।
বিষয়টি নিয়ে মহিলা পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ও দিনাজপুর জেলা শাখার সদস্য কানিজ রহমান বললেন, ‘আজ ইয়াসমিন স্মরণে মানববন্ধন করবো আমরা। তার স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ ও পাঠাগার পুনরায় চালুর জন্য আবেদন করা হবে৷’
তিনি উল্লেখ করেন, এখনও পত্রিকার পাতা খুললে আমরা ধর্ষণের খবর পাই। সঠিক বিচার না হওয়ায় ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলছে।
যেভাবে ঘটেছিল সেই নৃশংসতা
ঘটনাটি ছিল ১৯৯৫ সালের ২৩ আগস্ট দিবাগত রাতের। ঢাকা থেকে বাসে করে রাত ৩টার দিকে দিনাজপুরের দশমাইল মোড়ে এসে নামেন কিশোরী ইয়াসমিন আক্তার। তিনি ঢাকায় গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। গভীর রাতে একা দেখে সেখানে টহলরত পুলিশের একটি দল তাকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দেয়। এরপর তাকে পুলিশের পিকআপ ভ্যানে তুলে নেওয়া হয়। পথে তাকে ধর্ষণ করার পর নির্মমভাবে হত্যা করে মরদেহ মহাসড়কের পাশে ফেলে দেন তারা।
জনতার প্রতিরোধ ও পুলিশের গুলি
২৪ আগস্ট সকালে ইয়াসমিনের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধারের পর স্থানীয় প্রশাসন ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। এমনকি ইয়াসমিনের চরিত্র হনন করে মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হলে ফুঁসে ওঠে দিনাজপুরের সর্বস্তরের মানুষ। শুরু হয় তীব্র গণআন্দোলন। ২৭ আগস্ট ঘটনার প্রতিবাদ ও সব প্রশাসনিক কর্মকর্তার বদলি এবং দোষী পুলিশ কর্মকর্তাদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষুব্ধ জনতা শহরে একটি বিশাল মিছিল বের করে। মিছিলে লাঠিচার্জ করে পুলিশ। মুহূর্তেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মিছিলকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশ শহরের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচার গুলি চালালে সামু, কাদের, সিরাজসহ নাম না জানা সাতজন নিহত হন। আহত হন প্রায় তিন শতাধিক মানুষ। পরে শহরের চারটি পুলিশ ফাঁড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেন বিক্ষুব্ধ জনতা। শহরের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শহরে ১৪৪ ধারা (কারফিউ) জারি করা হয়। শহরে নামানো হয় বিডিআর (বর্তমান বিজিবি)। দিনাজপুর থেকে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। জনতার এই তীব্র প্রতিরোধের মুখে তৎকালীন বিএনপি সরকার বাধ্য হয় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করতে।
আইনি লড়াই ও ঐতিহাসিক ফাঁসি
নিরাপত্তার স্বার্থে মামলাটি দিনাজপুর থেকে রংপুরে স্থানান্তর করা হয়েছিল। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট রায় ঘোষণা করেন আদালত। এএসআই মঈনুল হক, কনস্টেবল আব্দুস সাত্তার এবং পিকআপচালক অমৃত লাল বর্মনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০০৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর এএসআই মঈনুল ও কনস্টেবল সাত্তারের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। আর অমৃত লালের ফাঁসি কায়কর করা হয় ২৯ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে।
নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস
ইয়াসমিন এবং তার হত্যার প্রতিবাদে শহীদ হওয়া ৭ জনের স্মরণে প্রতি বছর ২৪ আগস্ট দেশব্যাপী ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ বা ‘ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। দিনাজপুরের দশমাইল এলাকায় নির্মিত হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। এই দিনটি প্রতি বছর মনে করিয়ে দেয় নারীর নিরাপত্তা রক্ষা এবং যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের শক্তিকে।










